-->

গীতায় আলোচিত ৫টি মৌলিক তত্ত্ব

gita
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় আলোচিত পাচঁটি মৌলিক তত্ত্ব
শ্রীমদ্ভবদ্গীতার জ্ঞান নিত্য, পূর্ণ অভ্রান্ত কারণ তা পূর্ণ জ্ঞানময় এবং স্বয়ং ভগবান কর্তৃক প্রদত্ত ভগবদ্গীতা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের জন্যও নয় তা বিশ্বের প্রতিটি মানুষের জন্য, এমনকি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি জীবের জন্য বিশ্বের প্রতিটি মানুষ ভগবদ্গীতা অধ্যয়ন করে জীবনের অর্থ উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে পারে এবং জড়জাগতিক জীবনের ভয়াবহ অস্থিরতা, উৎকণ্ঠা অসুস্থতা থেকে চিরতরে মুক্ত হয়ে লাভ করতে পারে এক প্রকৃত আনন্দময় সুখী জীবন এই জ্ঞান সমাজে প্রয়োগ করা হলে, মানব-সমাজে ভোগবাদের প্রবল তাড়না অবক্ষয়ের বেগ প্রশমিত হয়ে বিশ্বসভ্যতা হতে পারে যথার্থ উন্নত-সংযম, শান্তি সমৃদ্ধিতে উজ্জ্বল
যেকোনো গ্রন্থ অধ্যয়ন করতে গেলে সে গ্রন্থের দর্শন জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা গ্রন্থটির ক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যতিক্রম নেই সমগ্র গীতা বারংবার অধ্যয়ন করেও যদি গীতার মুলতত্ত্ব না জানা যায়, তবে গীতা অধ্যয়নের কোনো তাৎপর্য থাকতে পারে না
মুল তত্ত্ব বা মৌলিক তত্ত্ব হচ্ছে সে সমস্ত বিষয় যেগুলোকে অবলম্বন করে সমগ্র গ্রন্থটি লিখিত হয়েছে আঠারটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত গীতা গ্রন্থে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা থাকায় মৌলিক তত্ত্বগুলোকে সহজে পৃথক করা যায় না বৈষ্ণব দার্শনিক শ্রীপাদ বলদেব বিদ্যাভূষণ স্বরচিতগীতাভূষণ’-ভাষ্যে মৌলিক তত্ত্বগুলোকে পৃথকভাবে উল্লেখ করেছেন
ভগবদ্্গীতায় মূলত পাঁচটি প্রধান মৌলিক তত্ত্ব আলোচিত হয়েছে- () পরমেশ্বর ভগবান, () জীব, () প্রকৃতি, () কর্ম এবং () কাল সংক্ষেপে আমরা এগুলো একটু আলোচনা করে নিতে পারি

) পরমেশ্বর ভগবান

অহং সর্বস্য প্রভবো মত্তঃ সর্বং প্রবর্ততে
আমি সমগ্র জড় চিন্ময় জগতের সমস্ত কিছুর উৎস সবকিছু আমার থেকেই প্রবর্তিত হয়
(ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, .গী. ১০/)
ভগবান, পরমব্রহ্ম, পরমাত্মা বা শ্রীকৃষ্ণ- যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন, তিনি হচ্ছেন সবকিছুর পরম উৎস, সর্বকারণের কারণ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ তিনি অসমোর্ধ্ব- তাঁর সমান কেউ নেই, তাঁর ঊর্ধ্বে কেউ নেই তিনি সকলের পরম সুহৃৎ, প্রভু নিয়ন্তা তিনি সমস্ত জড় এবং চিন্ময় জগতের প্রভু ভোক্তা তিনি নিত্য সনাতন পুরাণ-পুরুষ তিনি পূর্ণ এবং স্বরাট সমস্ত দেব-দেবী তাঁর আজ্ঞাবহ তিনি সমস্ত অবতারগণেরও উৎস ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চিন্ময় পরমচেতন তিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি জীবসত্তা, প্রতিটি বস্তু, এমন কি প্রতিটি পরমাণু সম্বন্ধেও পূর্ণ সচেতন এমনকি তিনি যখন কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যে এই জড়-সৃষ্টির মধ্যে অবতীর্ণ হন, তখন তাঁর চেতনা কখনও জড়ভাবের দ্বারা প্রভাবিত হয় না জড় এবং চিন্ময় জগতে অস্তিত্বশীল সবকিছুই ভগবান কৃষ্ণের সঙ্গে সম্পর্কিত তাঁকে যোগীরা সর্বভূতে বিরাজমান পরমাত্মারূপে উপলব্ধি করেন, জ্ঞানীরা ব্রহ্মরূপে উপলব্ধি করেন কিন্তু তাঁর ভক্ত তাঁর পূর্ণ-স্বরূপে, সচ্চিদানন্দময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণরূপে উপলব্ধি করেন

) জীব

মামৈবাংশো জীবলোকে জীবভূতঃ সনাতনঃ
জড়জগতে সমস্ত বদ্ধ জীবসত্তা আমারই সনাতন অংশ
(ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, .গী. ১৫/)
প্রতিটি মানুষ, উদ্ভিদ, প্রাণী- যাদেরই জীবন বা আত্মা আছে, তাদের বলা হয় জীব জীবাত্মা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিত্য, অবিচ্ছেদ্য বিভিন্নাংশ সেই জন্য জীব ভগবানের সঙ্গে গুণগতভাবে এক জীবাত্মা ভগবানেরই মতো নিত্য-জ্ঞানময় এবং আনন্দময়, ঠিক যেমন বড় অগ্নিকুণ্ড -এর একটি ছোট স্ফুলিঙ্গও আগুন কিন্তু পরিমাণগতভাবে জীব ভিন্ন ভগবান পূর্ণ, স্বরাট, আর জীব অণুস্বরূপে ক্ষুদ্র এবং পরতন্ত্র
জীব এবং ঈশ্বরের মধ্যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে প্রতিটি জীবই স্বরূপত ভগবানের সেবক, ভগবানের নিত্যদাস শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যেমন বলেছেন- জীবেরস্বরূপহয় কৃষ্ণেরনিত্যদাস জীব যখন কৃষ্ণসেবা বিস্মৃত হয়ে নিজে প্রভু হতে চায়, এবং জড়-ভোগবাসনা করে, তখন সে দুঃখময় জড়জগতে অধঃপতিত হয় এখানে তার কর্ম বাসনা অনুসারে সে একটির পর একটি জড় দেহ লাভ করে এবং অন্তহীন কাল ধরে জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবর্তিত হয় কিন্তু যখন সে ভগবান কৃষ্ণের শরণাগত হয়, ভগবদ্ভক্তি অনুশীলন করে, তখন পুনরায় তার চেতনা জড়-কলুষ থেকে মুক্ত হয় অন্যাভিলাষ শূন্য হয়ে ভক্তিময় সেবার ফলে সে অপ্রাকৃত আনন্দ অনুভব করতে থাকে এই অবস্থা লাভ তখনই সম্ভব হয়, যখন কেউ ভগবানের দিব্য নামসমূহ প্রতিনিয়ত শ্রবণ-কীর্তনের মাধ্যমে অভ্যাস করে, কারণ ভগবানের নামসমূহ চিন্ময় এবং ভগবান হতে অভিন্ন অবশেষে শুদ্ধ চেতনা বা কৃষ্ণচেতনা লাভ করে সে তার নিত্য চিন্ময়-স্বরূপে অধিষ্ঠিত হয় এবং দেহান্তে ভগবৎ-ধামে প্রত্যাবর্তন করে

) প্রকৃতি

ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে সচরাচরম্
আমার অধ্যক্ষতায় জড়া-প্রকৃতি স্থাবর-জঙ্গম সমন্বিত এই বিশ্বচরাচর প্রকাশ করে
(ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, ভগ.গী /১০)
প্রকৃতি দুই রকম: পরা বা শ্রেষ্ঠ চিন্ময়-প্রকৃতি এবং অপরা বা নিকৃষ্টা জড়া-প্রকৃতি পরা বা অপরা উভয় প্রকৃতিই ভগবান কৃষ্ণের শক্তি বা এনার্জি জড়া-প্রকৃতি হচ্ছে কৃষ্ণের বহিরঙ্গা মায়াশক্তি জড়া-প্রকৃতি সত্ত্ব, রজ তম এই ত্রিগুণাত্মিকা এবং জড়-প্রকৃতিতে আটটি উপাদান রয়েছে- মাটি, জল, আগুন, বায়ু আকাশ এবং মন, বুদ্ধি অহঙ্কার জড়া-প্রকৃতির মাধ্যমে জীবের জড়-দেহাদি সমন্বিত বৈচিত্র্যময় জড়জগৎ প্রকাশিত হয় জড়জগৎ অনিত্য, বিনাশশীল জড়জগতের সৃষ্টি হয়, তারপর কালের প্রভাবে একদিন মহাপ্রলয়ের মাধ্যমে বিনষ্ট হয় তারপর আবার সৃষ্টি হয় জগৎ তাই অলীক বা মিথ্যা নয় তা বাস্তব, কিন্তু অনিত্য
শ্রীকৃষ্ণকে ভুলে যাওয়ার ফলে জীব জড়া প্রকৃতির কবলীভূত হয় বদ্ধ-জীব তখন জড়া-প্রকৃতির তিনটি গুণের দ্বারা পরিচালিত হয় এভাবে সে প্রগাঢ় মায়া বা অজ্ঞানতায় আচ্ছন্ন হয় কিন্তু যখন কোনো জীব শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত হয়ে ভক্তিযোগে অনুশীলন করে, তখন তার মধ্যে দিব্যজ্ঞান প্রকাশিত হয় এই দিব্যজ্ঞানরূপ আগুন সমস্ত গুণজাত কলুষকে ধ্বংস করে সে তখন তার শুদ্ধ চিন্ময়, গুণমুক্ত অবস্থা পুনরায় প্রাপ্ত হয় এভাবে ভগবৎকৃপায় সে অত্যন্ত শক্তিশালী গুণময় বহিরঙ্গা মায়াশক্তিকে সহজেই অতিক্রম করতে সমর্থ হয় এবং জড়-বন্ধন হতে মুক্ত হয়

) কর্ম

যজ্ঞার্থাৎ কর্মণোহন্যত্র লোকোহয়ং কর্মবন্ধনঃ
ভগবান বিষ্ণুর প্রীতিবিধান করার জন্য কর্ম করা উচিত তা না হলে কর্ম জীবকে জড়জগতের বন্ধনে আবদ্ধ করে
(ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, .গী. /)
জীব স্বরূপত চিন্ময় আত্মা এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিত্যদাস প্রত্যেক জীবনের মধ্যে স্বাধীন ইচ্ছা থাকে যখন সে এই ইচ্ছার অপব্যবহার করে, তখন সে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মতোই প্রভু ভোক্তা হবার বাসনা করে তার ফলে সে কারাগার বা সংশোধনাগার স্বরূপ এই জড়জগতে অধঃপতিত হয় এখানে সে প্রকৃতির সম্পদের প্রভু হওয়ার জন্য সচেষ্ট হয় এবং তা জড়দেহ দিয়ে ভোগ করার চেষ্টা করে এই জন্য সে কর্ম করে রকম কামনা পূরণের জন্য যে কর্ম করা হয়, তাকে বলা হয় সকাম কর্ম
প্রত্যেক কর্ম আবার ফল প্রসব করে কর্ম করা মাত্রই জীব তার ফলভোগ করার জন্য বাধ্য থাকে একে বলা হয় কর্মবন্ধন শুভ কর্মের ফলে স্বর্গাদি সুখ লাভ হয়, আর অশুভ পাপকর্মের ফলে দুঃখভোগ করতে হয় সব ফলভোগের জন্য জীবকে মৃত্যুর পর আর একটি জড়দেহে প্রবেশ করতে হয় পূর্ব কর্ম অনুসারে বিশেষ ধরনের দেহ লাভ হয় এভাবে অন্তহীন কাল ধরে কর্মভোগ চলতে থাকে- যত দিন না জীব ঐকান্তিকভাবে ভগবানের শরণাগত হয় ভক্তিযোগের মাধ্যমে জীব ভগবানের সেবায় যুক্ত হয় এবং ভগবানের প্রীতিবিদানের উদ্দেশ্যে তখন সে কর্ম করে
রকম কর্মে নিজের ইন্দ্রিয়তৃপ্তি নয়, ভগবানের অপ্রাকৃত ইন্দ্রিয়তৃপ্তির বাসনা থাকে ভক্তিসেবাময় এই রকম কর্মই হচ্ছে নিষ্কাম কর্ম এই রকম প্রীতিময় সেবাকর্মের ফলে চেতনা নির্মল হয়, এবং কোটি কোটি জন্মের কর্মফল ধ্বংস হয় ক্রমশ জীব নিত্য কৃষ্ণদাসরূপে নিজের আত্মস্বরূপ উপলব্ধি করতে পারে এবং চিরতরে কর্মবন্ধন জড় দেহবন্ধন হতে মুক্ত হয়

) কাল

অহমেবাক্ষয়ঃ কালো-
আমিই ক্ষয়হীন অনন্ত কাল। (ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, .গী. ১০/৩৩)
কালোহস্মি লোকক্ষয়কৃৎ প্রবৃদ্ধো
আমিই জগৎসমূহের ধ্বংসকারী মহাবলশালী কাল
(ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, .গী. ১১/৩২)
কালও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শক্তি কালের নিয়ন্ত্রণের অধীনে জড়াপ্রকৃতির তিনটি গুণের মিশ্রণে জড়জগতের যাবতীয় কার্যকলাপ সম্পন্ন হয় কালশক্তি অনুঘটক হিসেবে সমস্ত জড়বস্তুর ক্রমাগত পরিবর্তন ঘটায় কালের প্রভাবে জীবদেহের প্রতিনিয়ত রূপান্তর বিনাশ ঘটে এবং ভৌতিক জগতের প্রকাশ, স্থিতি প্রলয় হয় কালের প্রভাব কেবল জড়জগতে রয়েছে, -জড় অপ্রাকৃত ভগবৎধামে কালের কোনো প্রভাব নেই
যদ্ গত্বা নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম
আমার সেই পরমধামে একবার গেলে, আর এই জড়জগতে ফিরে আসতে হয় না
(ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, .গী.১৫/)
কোটি কোটি জড়-ব্রহ্মা- রয়েছে একে বলা হয় জড় জগৎ জড়জগতের সমস্ত গ্রহলোকই বার বার জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধিজনিত দুঃখক্লেশে পূর্ণ আসলে জড়জগৎ হচ্ছে অত্যন্ত ক্লেশময় অন্ধকার কারাগারের মতো এটি হচ্ছে কৃষ্ণসেবা নিমুখ বদ্ধজীবের রোগমুক্ত হবার স্থান বা সংশোধনাগার ভগবান কৃষ্ণ জড়জগতের মাধ্যমে আমাদের ভোগবাসনা পূরণের সুযোগ দান করেছেন তিনি চান, আমরা যেন এই নশ্বর জগতের অপরিহার্য দুঃখক্লেশ উপলব্ধি করি তিনি এই জগৎকে বলেছেন দুঃখালয়ম্ অশাশ্বতম্- তা দুঃখের আলয় এবং তা বিনাশশীল
আমরা ভগবানেরই নিত্য, অবিচ্ছেদ্য বিভিন্নাংশ, আমরা স্বরূপত ভগবানেরই মতো জড়াতীত, চিন্ময় তাই আমাদের চিরনিত্য আলয়  হচ্ছে অপ্রাকৃত ভগবৎধাম- ভগবানের আলয় এই দুঃখময় নশ্বর জড়জগৎ আমাদের নিত্য আশ্রয়স্থান নয়
ভগবান কৃষ্ণের অভিলাষ হচ্ছে, প্রতিটি বদ্ধজীব যেন ভগবদ্ভক্তি অনুশীলনের মাধ্যমে তাদের চেতনাকে শুদ্ধ করে এবং তাঁর ধামে তাঁর কাছে ফিরে যায় (তদ্ধাম পরমং মম- .গী ১৫/)

একটি মাছকে জল থেকে তুলে এনে অনেক যত্ন করলেও যেমন সে ক্ষণকালও সুখী হয় না, তেমনই এই দুঃখময় জগতে কেউই আসলে সুখী নয় সকলেই উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর দুঃখে জর্জরিত তাই জগতের বাহ্যিক চাকচিক্য আর জৌলুসে মুগ্ধ না হয়ে, আমাদের গভীরভাবে জীবনের চরম উদ্দেশ্য সাধনে ব্রতী হওয়া উচিত অপরকেও আধ্যাত্ম-জ্ঞানের সংস্পর্শে এনে তার পরম উপকার সাধন করা উচিত আর বিশেষত ভারতবাসী হিসেবে আমাদের বিশেষ কর্তব্য হচ্ছে এই সু-উন্নত পারমার্থিক জ্ঞান সমগ্র বিশ্ববাসীকে দান করা এবং বিশ্বমানব সভ্যতার যথার্থ কল্যাণ সাধন করা

0 মন্তব্য