-->

ইসকন প্রতিষ্ঠার সাতটি প্রধান উদ্দেশ্য

seven-vision-of-iskcon
যখন কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ ১৯৬৬ সালে পাশ্চাত্যে প্রথম হরেকৃষ্ণ আন্দোলনের সূচনা করলেন তখন তিনি সাতটি উদ্দেশ্যের কথা লিখেছিলেন, যা থেকে স্পষ্ট হওয়া যায় যে, এই ‘আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ’ (ইসকন) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি কী চেয়েছিলেন।
শ্রীল প্রভুপাদ যখন প্রথম তাঁর গুরুদেব শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন, সেই প্রথম সাক্ষাতেই তাঁর গুরু মহারাজ তাঁকে পাশ্চাত্যে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের উপদেশ প্রদান করেছিলেন এবং শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর তাঁর অপ্রকটের দিন কয়েক আগে তাঁর শিষ্য অভয়চরণকে (ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য শ্রীল প্রভুপাদ) তাঁর লেখা শেষ চিঠিতে সেই একই নির্দেশের পুনরাবৃত্তি করেছিলেন।
 ইসকনের মতো একটি সংঘ গঠনের লক্ষ শ্রীল প্রভুপাদের কাছে নতুন কিছু নয়।
এমন একটি সংঘ গঠনের জন্য শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও তাঁর গুরু মহারাজের কাছ থেকে প্রাপ্ত গুরু-শিষ্য পরম্পরাগত জ্ঞান তো তাঁর ছিলই, সেই সঙ্গে তাঁর ছিল দৃঢ়ব্রততা ও নিজস্ব দূরদৃষ্টি। আমাদের আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) প্রতিষ্ঠাতা-আচার্যরূপে তিনি কৃষ্ণভাবনামৃতের সার বার্তাটি তুলে ধরেছিলেন, কিন্তু স্থান, কাল ও পরিস্থিতি অনুযায়ী তিনি তার প্রয়োগ করেছিলেন। শ্রীল প্রভুপাদ যখন তাঁর সত্তর বছর বয়সে এসেছিলেন, তিনি তখন ঠিক যেন ভেসে বেড়াচ্ছিলেন। সঙ্গে তেমন কোনো টাকা-পয়সা নেই, স্বল্প সময়ের ভিসা, কোথায় থাকবেন তার স্থিরতা নেই; কিন্তু অবশেষে কিছু মানুষ তাঁর কথা শ্রবণ করতে এগিয়ে এলেন এবং নিউইয়র্কের ডাউন টাউনে তাঁকে আমন্ত্রণ জানালেন। আর সেই সময় থেকেই তিনি একটি সংঘ গড়ে তোলার পরিকল্পনা শুরু করলেন। সেই সময়ে তিনি যেসব চিঠি লিখতেন সেখানে ইতিমধ্যেই তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস’ নামটি উল্লেখ করতে শুরু করেছিলেন। পৃথিবীতে যত নগরাদি গ্রাম রয়েছে সর্বত্র পবিত্র নাম কীর্তন প্রকাশিত হবে এই অভিপ্রায়টি মূলতকৃষ্ণ হতে প্রকাশিত হয়ে ক্রমে ক্রমে গুরু-শিষ্য পরম্পরা ধারায় নেমে এসে ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য শ্রীল প্রভুপাদের কাছে পৌঁছেছিল এবং প্রকৃতপক্ষে তিনিই কৃষ্ণের সেই অভিপ্রায়কে বাস্তবায়িত করলেন।
ইসকন একটি ধর্মীয় সংগঠনরূপে আইনসিদ্ধভাবে নিবন্ধিকৃত হয়েছিল ১৯৬৬ সালের জুলাইয়ে, নিউইয়র্কে। শ্রীল প্রভুপাদকে তখন ধর্মটির বর্ণনা করার জন্য কিছু সনদ তৈরি করতে হয়েছিল এবং সেই সনদে শ্রীল প্রভুপাদ ইস্কন প্রতিষ্ঠার সাতটি উদ্দেশ্যকে তুলে ধরেছিলেন, যা আজও ইস্কনের কর্মধারার প্রেরণাস্বরূপ। সেই সাতটি উদ্দেশ্য হলো-

১. সুসংবদ্ধভাবে মানবসমাজে ভগবত্তত্ত্বজ্ঞান প্রচার করা এবং সমস্ত মানুষকে পারমার্থিক জীবনযাপনে অনুপ্রাণিত হতে শিক্ষা দেওয়া, যার ফলে জীবনের যথার্থ উদ্দেশ্য সম্বন্ধে বিভ্রান্তি প্রতিহত হবে এবং জগতে যথার্থ সাম্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।

পারমার্থিক জীবনের বিস্তৃত বর্ণনার ক্ষেত্রে এটি একটি ভূমিকাগোছের বক্তব্য মাত্র; কিন্তু এটি কেবল কথার কথাই নয়, এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে যেটি, যারা ইস্কন সম্বন্ধে কোনোকিছুই জানে না, তাদের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। একটি অসাম্য রয়েছে; মানুষের মূল্যবোধের প্রবণতার পাল্লা জাগতিক দিকেই ভারী হয়ে আছে এবং এটিই হচ্ছে জগতে উপদ্রব এবং অনৈক্যের কারণ। অবশ্যই এই অসাম্য বা ভারসাম্যহীনতার সংশোধন ঘটাতে হবে আর সেটি ইস্কনের উদ্দেশ্যসমূহের একটি। কেবলমাত্র এককভাবে ইস্কনের কোনো অস্তিত্ব থাকতে পারে না; সামগ্রিকভাবে ইস্কন সমাজেরই অংশ। তাই এই যে কেবল জাগতিক উচ্চাকাক্সক্ষা অর্জনের চেষ্টার জন্য মানুষ ছুটছে, এই ভারসাম্যহীনতাকে প্রতিরোধ করার জন্যই এই ইস্কন। ইস্কনের উদ্দেশ্য হচ্ছে এই শিক্ষা প্রদান করা যে, আপনার ব্যক্তিগত জীবনে প্রয়োগ করার মতো কার্যকরী বস্তু বা পদ্ধতি রয়েছে, যা আপনার ভারসাম্যহীনতাকে প্রতিরোধ করবে, যাতে আপনি কেবলমাত্র একজন জড় জাগতিক ব্যক্তিতে পরিণত না হন। আর ইস্কন হচ্ছে সেই স্থান যেখানে গিয়ে আপনি সেই পদ্ধতিসমূহ শিখতে পারবেন। তাই একেবারে প্রথম থেকেই লক্ষ্যটি হবে পারমার্থিক। এটি একটি পারমার্থিক আন্দোলন, এটি জগতকে কোনো জড় কল্যাণ নিবেদন করছে না। জগতের প্রকৃতপক্ষে যেটি প্রয়োজন- সেটি হলো পারমার্থিক কল্যাণ। এটি একটি অত্যন্ত বৃহৎ প্রয়োজনীয়তা এবং অত্যন্ত স্বল্প স্থানই রয়েছে যেখানে এই ধরনের স্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য পারমার্থিক জীবনের শিক্ষা প্রদান করা হয় এবং অনুশীলন করানো হয়।

২. শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা এবং শ্রীমদ্ভাগবতের অনুসরণে কৃষ্ণভাবনার অমৃত প্রচার করা।

সাধারণ বর্ণনা হতে এবার আমরা অত্যন্ত নির্দিষ্ট একটি জায়গায় এলাম যে যাঁকে বর্ণনা করা হবে, তিনি হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণ। আর শ্রীকৃষ্ণ কে? আপনি যদি ভগবদ্গীতা এবং শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ করেন তাহলে আমি সেটা জানতে পারবেন। ‘কৃষ্ণ কনশাসনেস’ এই নির্দিষ্ট ইংরেজি শব্দটিও শ্রীল প্রভুপাদেরই অবদান। ষোড়শ শতাব্দীতে বৃন্দাবনের গোস্বামীগণের অন্যতম শ্রীল রূপ গোস্বামী ব্যবহৃত একটি পদ ‘কৃষ্ণ-ভক্তি-রসভাবিতা’ অর্থ্যাৎ “কৃষ্ণের প্রতি ভক্তিপূর্ণ সেবার রসাস্বাদনে যিনি মগ্ন” এই পদটি থেকে ‘কৃষ্ণ কনশাসনেস’ বা ‘কৃষ্ণভাবনামৃত’ কথাটির উদ্ভব হয়েছে। ইংরেজিতে এই ‘কৃষ্ণ কনশাসনেস’ শব্দ বা কথাটিকে শ্রীল প্রভুপাদ এক নিবিড় শব্দবন্ধনের রূপ দান করেছিন।
‘কনশাসনেস’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে ভাবনা করা, ভাবের একটি অবস্থা বা চেতনা এবং আপনি এর সঙ্গে শুধু ‘কৃষ্ণ’ বা ভগবান যোগ করেন। এই হচ্ছে শ্রীল প্রভুপাদের, শ্রীল রূপ গোস্বামীর পদটির অনুবাদ- সর্বদা কৃষ্ণের ভাবনায় মগ্ন থাকা। সাধারণত সাধারণ মানুষ তাদের নিজ নিজ আকাক্সক্ষা অনুসারে অন্য ধরনের চেতনার মধ্যে কৃষ্ণকে নিয়ে আসার প্রচেষ্টার অনুশীলন করছি। শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান স্বয়ং এবং ভগবদ্গীতা ও শ্রীমদ্ভাগবতে এই কথা বলা হয়েছে। যখন শ্রীল প্রভুপাদ ঘোষণা করেছিলেন যে তিনি এই সংঘকে “দ্য ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস” নামে অভিহিত করেছেন, তখন অনেকেই প্রশ্ন করেছিলেন, “কেন এর পরিবর্তে আপনি “দ্য ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর গড কনশাসনেস” নাম রাখছেন না? তাহলে সেটা মানুষের কাছে আরও আকর্ষণীয় হবে।” কিন্তু শ্রীল প্রভুপাদ এই ধারণাটি খুব একটা পছন্দ করলেন না। তিনি বললেন, “আমি যদি শুধু ভগবান বলি, তাহলে প্রশ্ন উঠবে, কে এই ভগবান? আর জিজ্ঞাসাকারীরা তখন নানাধরনের বানানো ধারণার আনয়ন করবে যে, এই হচ্ছে ভগবান, ভগবান হচ্ছেন আলোক অথবা আপিনও ভগবান হতে পারেন ইত্যাদি। কিন্তু আমি যদি শুধু কৃষ্ণ বলি সেক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা থাকে না। কারণ কৃষ্ণই হচ্ছেন পরম পুরুষোত্তম ভগবান।” অতএব, কিছু জনপ্রিয় আবেগের নিরিখে যা কিছু আমরা হারাই না কেন, সংহতির মাধ্যমে আমরা লাভবান হচ্ছি। যারা প্রকৃতই পারমার্থিক জীবন গ্রহণ করবেন এবং কৃষ্ণ বিষয়ে অনুসন্ধান করবেন, তাঁরা ততই বিজ্ঞানসম্মত নাম এবং অর্থবহ নাম প্রাপ্ত হবেন।
এটি সস্তা অনুগামীদের জন্য কোনো সস্তা আন্দোলন নয়। এই আন্দোলনের লক্ষ্য রয়েছে। কৃষ্ণচেতনায় উন্নতি লাভের সঙ্গে সঙ্গে এই আন্দোলনের সদস্যরা সমাজকেও ব্যাপকভাবে শিক্ষা প্রদান করছেন। এ থেকে বোঝা যায় যে, এই আন্দোলনের অবশ্যই কিছু কার্যক্রম রয়েছে; এই আন্দোলন এক তরঙ্গ সৃষ্টি করতে চলেছে, এই আন্দোলন মানুষকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে এবং পারমার্থিক জীবনের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে বলছে।

৩. এই সংস্থার সদস্যদের পরস্পরের কাছে টেনে আনা এবং শ্রীকৃষ্ণের কাছে টেনে আনা এবং এইভাবে প্রতিটি সদস্যচিত্তে এমনকি প্রতিটি মানুষের চিত্তে সেই ভাবনার উদয় করানো যাতে সে উপলব্ধি করতে পারে যে, প্রতিটি জীবই হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন অংশ।

এটিই হলো প্রকৃত ‘একতা’র বিষয়। এক উষ্ণ, সামাজিক প্রস্তাব এই উদ্দেশ্যটির মধ্যে নিহিত রয়েছে। সেটি হলো এই যে, এই সংঘ মানুষকে মানুষের কাছে নিয়ে আসছে। আমি দেখেছি যে এইরকম একটি উদ্দেশ্য বেলফাস্ট মন্দির নির্মাণের সময়েও কাজ করেছিল। “সম্মিলিতভাবে কৃষ্ণের সেবা।” এই ব্যাপারটি খুবই সুন্দর। আমাদের একটি সংঘ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইস্কন)। কিন্তু আমাদের সংঘটি এরকম নয় যে, সদস্যদের নাম ঠিকানা কম্পিউটারে রাখা আছে আর সেই নাম ঠিকানা ধরে ধরে এক দুইবার কেউ শুধু তাদের কাছে চাঁদার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠাবে। একে একত্রিত হওয়া বলে না। বাস্তবে এর কোনো মানেই হয় না। না, সদস্যদের মধ্যে অবশ্যই পারস্পরিক সম্বন্ধ থাকবে এবং এটি কেবল তাদের আলাদা একটি দলের মতো, এমন নয়। তারা পারস্পরিক ভাব ও প্রীতিবিনিময় করবেন এবং তাঁরা কৃষ্ণের কাছের মানুষ হয়ে ওঠার চেষ্টা করবেন। সেটিই হবে মূল লক্ষ্য। অতএব কৃষ্ণই হচ্ছেন আমাদের সংঘের মধ্যমণি আর তাই কৃষ্ণকে কেন্দ্র করেই আমরা পরস্পর পরস্পরের কাছাকাছি হচ্ছি। একবার আমেরিকার এক সংবাদ মাধ্যমের প্রশ্নকর্তা শ্রীল প্রভুপাদকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে প্রশ্ন করেছিল, “আমি আপনাদের দর্শন থেকে যা বুঝলাম তা হলো, আপনারা ভ্রাতৃত্ব বা সাধারণ মানুষের মধ্যে পরস্পরিক প্রীতিময় ব্যবহারের প্রতি তেমন একটা গুরুত্ব আরোপ করেন না, যা আমরা খ্রিষ্টিয় সংস্কৃতিতে করে থাকি; এটিকে তাই শুধু, ভগবান ও ব্যক্তি সম্বন্ধীয় কথাবার্তা বলে মনে হয়। আপনি কি মনে করেন না যে, মানুষের একে অপরকে ভালোবাসার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?” শ্রীল প্রভুপাদ এর উত্তরে দৃঢ়তার সাথে বলেছিলেন, “না। এটি গুরুত্বপূর্ণ নয়।” আসলে এ ব্যাপারটি আলাদা করে শিক্ষা প্রদান করার মতো কিছু নয়। আপনি যদি ঐরকম শিক্ষার উপরে অত্যধিক জোর দেন, তাহলে কীভাবে একে অপরের সম্পর্কের উন্নতি হবে সেই শিক্ষার সঙ্গে আপনার ধর্ম ব্যাপারটি গুলিয়ে যাবে। কিন্তু আপনি যদি কেবলমাত্র কৃষ্ণকে ভালোবাসার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তাহলে আপনা থেকেই অন্যের প্রতি যত্নশীল হওয়ার শিক্ষাটিও সম্পাদিত হবে। আমরা যদি কৃষ্ণের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের উন্নতি ঘটাই, তাহলে কীভাবে আমরা অন্যদের ভালো না বেসে থাকতে পারব? কৃষ্ণকে ভালোবাসার অর্থই হচ্ছে তাঁর অঙ্গাঙ্গী সমস্ত কিছুকেই ভালোবাসা আর তাই এখন আমাদের কাছে ভ্রাতৃত্ব-সুলভ ভালোবাসার প্রকৃত কারণটিও রয়েছে। কেননা সকলেই হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণের পুত্র ও কন্যা। সুতরাং আমরা যদি প্রকৃত অর্থেই পিতাকে ভালোবাসি আমাদের অবশ্যই তাঁর পরিবারের বন্ধু হয়ে উঠতে হবে। তাই শ্রীল প্রভুপাদ উভয়ের কথাই এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন।
এটি সত্যি যে, প্রতিটি জীবকে আত্মারূপে এবং কৃষ্ণের অবিচ্ছেদ্য অংশরূপে দর্শন, জীবনে এক নতুন সামাজিক মাত্রা যোগ করে। তাই “একত্রে কৃষ্ণ সেবা” কথাটি সে কথাই বর্ণনা করছে। এই ভাবেই আমরা প্রেমময়ী ভাব বিনিময়ের উন্নয়ন ঘটাতে পারি। আমরা নিজেরা জপ বা কীর্তন করি এবং গ্রন্থ অধ্যয়ন করি এবং অন্যদের জন্যও কীর্তন করার ও কৃষ্ণকথা শ্রবণের আয়োজন করি। কেউ গুরুরূপে সেবা প্রদান করছেন, কেউ শিষ্যরূপে সেবা প্রদান করছেন, কিন্তু তাঁরা উভয়েই হচ্ছেন দাস। কৃষ্ণই হচ্ছেন একমাত্র তিনি, যাঁকে সেবা করা হয়। আর এইভাবেই আমরা কৃষ্ণকে কেন্দ্র করে পরস্পর পরস্পরের কাছে আসি বা ঘনিষ্ঠ হই। এটি কোনো জাগতিক বা শারীরিক ঘনিষ্ঠতা নয়, এমন কি কৃষ্ণহীন কোনো মানসিক প্রচেষ্টাও নয়।

৪. শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রবর্তিত সমবেতভাবে ভগবানের দিব্যনাম কীর্তন করার যে সংকীর্তন আন্দোলন, সে সম্বন্ধে সকলকে শিক্ষা দেওয়া এবং অনুপ্রাণিত করা।

এটি সেই সামাজিক বিষয়টিকেই অনুসরণ করছে যে আমরা পরস্পর একত্রিত হওয়ার লক্ষ্যেই অগ্রসর হচ্ছি এবং যখন আমরা একত্রিত হই তখন একত্রে আমরা কীর্তন করি। এইটিই ভক্তদের কর্তব্যসমূহের মধ্যে অন্যতম প্রধান বিষয়। এটি একটি অত্যন্ত সহজ প্রস্তাব এবং শ্রীল প্রভুপাদ যেখানেই এই শিক্ষাটি প্রদান করেছেন। তিনি মানুষকে একত্রিত করেছিলেন এবং তাদের সমবেত কীর্তনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

৫. সংস্থার সদস্যদের জন্য এবং সমস্ত সমাজের জন্য পবিত্র স্থান নির্মাণ করা যেখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর নিত্যলীলাবিলাস করবেন এবং পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে তা নিবেদিত হবে।

সেটি ছিল ১৯৬৬ সাল এবং তখন আমাদের কেবল একটি কেন্দ্র ছিল; সেকেন্ড এভিনিউয়ের গুদামঘরের সম্মুখভাগ। কিন্তু এখানে শ্রীল প্রভুপাদ মন্দির প্রসঙ্গে বলছেন। এখন আমাদের বহু এরকম স্থান রয়েছে- নগরে, শহরে, গ্রামে; ছোট মন্দির, বড় মন্দির এবং সমস্ত ধরনের পারমার্থিক স্থান। এগুলো কেবলমাত্র ভূ-সম্পত্তি বা অট্টালিকার মালিক হওয়া নয়। যেহেতু বাস করার জন্য মানুষের গৃহের প্রয়োজন, বিশেষত সমবেতভাবে বাস করার জন্য। তাই মন্দির হচ্ছে সমবেতভাবে সংঘের ভক্ত বা সদস্যদের বাস করার জন্য। এগুলো মোটেও জড়বস্তু নয়। এগুলো পারমার্থিক বা চিন্ময় বস্তু। যখন এইসব অট্টালিকাগুলোকে কৃষ্ণের সেবার জন্য উৎসর্গ করা হয়, তখনি সেগুলো চিন্ময় হয়ে যায়। তাই যেসব মন্দির বা অট্টালিকা ও উদ্যান রয়েছে, তাদের সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। মানুষকে এখানে আমন্ত্রণ জানানো উচিত এবং এগুলোকে খুব সুন্দরভাবে যত্ন করা উচিত। ভক্তদের চেতনাটি এরকম হওয়া উচিত যে অতিথিগণ সকলেই হচ্ছেন রাধা-মাধবের সেবক।

৬. একটি সরল এবং অত্যন্ত স্বাভাবিক জীবনধারা সম্বন্ধে শিক্ষা দেওয়ার জন্য সদস্যদের পরস্পরের কাছে টেনে আনা

এটি হচ্ছে তৃতীয় উদ্দেশ্যটির পুনরাবৃত্তি এবং “আরও স্বাভাবিক ও সরল জীবন যাপন” কথাটির মধ্যে একটি ইঙ্গিত বা আভাস রয়েছে। এই কথাটি গ্রামীণ সম্প্রদায়কে নির্দেশ করছে। নগরীর মন্দিরে আমরা এই ব্যাপারে হয়তো ততটা জোর দিতে পারি না কেননা নগরীর পরিকাঠামোর আমরা ব্যক্তি মানুষেরাও একটি অংশ আর তাছাড়া নগরীর প্রশাসক, টেলিফোন, পুলিশ ও ট্যাক্স বিভাগের মানচিত্রে আমাদের মন্দির একটি অট্টালিকার হিসাব ছাড়া আর কিছুই না। তবুও আমরা যতটা সম্ভব সরল জীবন যাপন করার চেষ্টা করি এবং অর্থনৈতিক সমাধানের জন্য গোরক্ষা ও ভূমিনির্ভর জীবন যাপন করার শিক্ষাও প্রদান করি। শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন, একদিন আসবে যেদিন নাগরিক জীবন বলে কিছুই থাকবে না। শ্রীল প্রভুপাদ যখন আমাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সে সময় তিনি খামারবাড়ির উন্নয়নের জন্য কী কী করা উচিত সে বিষয়ে আমাদের নির্দেশ প্রদান করতেন। সারা পৃথিবীজুড়ে ইস্কনের বহু খামারকেন্দ্র তিনি পরিদর্শন করেছিলেন।

৭. পূর্বোল্লিখিত উদ্দেশ্যসমূহ সাধন করবার জন্য সাময়িক পত্রিকা, গ্রন্থ ও অন্যান্য লেখা প্রকাশ করা ও বিতরণ করা।

এই উদ্দেশ্যটি সবার শেষে লিখিত হলেও, এর গুরুত্ব কম নয়। এই উদ্দেশ্যটি সেই উপায়েরই ইঙ্গিত বহন করছে যে উপায়ে অন্যান্য উদ্দেশ্যগুলো সাধিত হবে। শ্রীল প্রভুপাদ বলছেন, “অন্য সকল উদ্দেশ্যগুলো অর্জন করার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমাদের গ্রন্থের মাধ্যমেও জ্ঞানের প্রচার করতে হবে” এবং শ্রীল প্রভুপাদ নিজেও তা-ই করেছিলেন। তিনি গ্রন্থ অনুবাদ করেছেন, ভক্তিবেদান্ত তাৎপর্য রচনা করেছেন এবং তাঁর গ্রন্থ, পত্রিকা ও অন্যান্য লেখাগুলো বিতরণ করার জন্য তাঁর ভক্তদের অনুরোধ করেছেন। এই পরিকল্পনাটিও এসেছিল তাঁর গুরু মহারাজের কাছ থেকে।
একবার বৃন্দাবনের রাধাকু-ের কোনো একটি অনুষ্ঠান উপলক্ষে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর যখন তাঁর শিষ্যদের বলেছিলেন, “যদি তোমরা কখনও অর্থ জোগাড় করতে পারো, তাহলে গ্রন্থ ছাপিও”, তাঁর গুরু মহারাজের এই নির্দেশকে শ্রীল প্রভুপাদ মনেপ্রাণে গ্রহণ করেছিলেন এবং যখন আমেরিকায় তাঁর শিষ্যদের কাছ থেকে অর্থ পেতে শুরু করলেন, তিনি গ্রন্থ ছাপিয়েছিলেন। যখন এই গ্রন্থগুলো ব্যাপকভাবে ছাপা ও বিতরিত হতে লাগল তখন ইস্কনের অন্য ছয়টি উদ্দেশ্য রূপায়ণেও তা স্বাভাবিকভাবেই সাহায্য করেছিল এবং এখনও করে চলেছে।
শ্রীমৎ সৎস্বরূপ দাস গোস্বামী মহারাজ

0 মন্তব্য