রথযাত্রা মহোৎসব;এক অজানা ইতিহাস

রথযাত্রা মহোৎসব; এক অজানা ইতিহাস

দ্বারকার রাজা শ্রীকৃষ্ণ। তাঁর ষোলো হাজার একশ আটজন রূপবতী-গুণবতী রানী। তাঁরা সকলেই পতিসেবায় তৎপর। বহু গুণবন্ত অমাত্যবর্গ এবং দাস-দাসী। প্রভু শ্রীকৃষ্ণ অসুস্থ। বড় বড় বৈদ্য এসেও তাঁর রোগ নির্ণয় অক্ষম। প্রচণ্ড জ্বর। খুব আনমনা। মাঝে মাঝে কী সব প্রলাপ বকতে থাকেন। কারও কারও নাম উচ্চারণ করেন। রানীরা অনুমান করলেন, সেই নামগুলো বৃন্দাবনের কারও হবে, যারা বিগত দিনে ছোটবেলাকার সঙ্গী-সাথী ছিল। আমাদের কাছে প্রভু শয়ন করেন। কিন্তু প্রভুর মন আমাদের কাছে নেই। প্রভুর শরীরও গরম, প্রভুর মনও কোথায় চলে গেছে। বেহুঁশ। এই রকম পরিস্থিতির মধ্যে সবাই চিন্তান্বিত হলেন, কীভাবে প্রভুকে সুস্থ করা যায়!
hksamacar
এমন সময় দেবর্ষি নারদ সেখানে এলেন। রুক্মিণী দেবী উদ্বিগ্ন হয়ে তাঁকে প্রভু শ্রীকৃষ্ণের দশার কথা জানালেন। নারদ বললেন, উনি কীভাবে সুস্থ হবেন, তার একটি উপায় আমি জানি। এখান থেকে চিকিৎসা করিয়েও প্রভুর রোগের উপশম সম্ভব হবে না। এখন তিনি অচেতন অবস্থায় রয়েছেন, যদি চেতনাও ফিরে, অমনি তাঁর মনের মতো লোকদের সঙ্গে না দর্শন অবধি ব্যাধির পরিবর্তন হবে না। তাই এই অবস্থায় উনাকে বৃন্দাবনে নিয়ে যেতে হবে। এখন বৃন্দাবনের অবস্থাও খুব খারাপ। ব্রজবাসীরা প্রভুর চিন্তা করতে করতে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা পদ্ধতি সম্পূর্ণ ব্যাহত হয়েছে, তাই শুধু নয়, তারা মৃতপ্রায়। তাদের অবস্থা খুব শোচনীয়! তাই সবার আগে একজন ব্যক্তিকে ব্রজে যেতে হবে, যিনি সেই ব্রজবাসীদের কাছে পরিচিত। তিনি গিয়ে যশোদারানী, নন্দ মহারাজ এবং গোপ-গোপীদের জানিয়ে দেবে, তোমরা সবাই জেগে ওঠো কৃষ্ণ আসছে, তোমরা তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য প্রস্তুত হও। সে কথা শুনে তারা প্রস্তুত হতে থাকবে। সেজন্য পরিচিত ব্যক্তি কে আছে, যে যাবে ব্রজে।
শ্রীবলরাম সেখানে ছিলেন। বলরামকে ব্রজবাসী সবাই চেনে। ব্রজবাসীর অবস্থা যদি শোচনীয় হয়ে থাকে, তবে তারা আমার কথায় কর্ণপাত করবে না। আমি কৃষ্ণের কথামতো ব্রজে গিয়ে দুই মাস ছিলাম, সেখানে নন্দ মহারাজ, যশোদা মাতা থেকে শুরু করে সমস্ত লোকদের সান্ত¦না দিয়ে বলেছিলাম, তোমরা দুঃখ করো না, শ্রীকৃষ্ণ অতিসত্ত্বর আসছে। তারপর আমি তাদের থেকে বিদায় নিয়ে আমি চলে আসি। কৃষ্ণকে কতবার বললাম, কৃষ্ণ চলো, একবার বৃন্দাবনে যাও, তোমার জন্য তারা খুব কান্না করছে। কিন্তু আজ বহু বছর হয়ে গেল, কৃষ্ণ গেল না। এখন তাদের অবস্থা আরও অধিকতর খারাপ, আবার, আমি আজ বহু বছর পর কোন মুখে তাঁদের কাছে সেই কথা বলতে যাব, তোমরা দুঃখ করো না, কৃষ্ণ আসছে?

নারদ মুনি বললেন, উদ্ধব ওখানে যেতে পারে, প্রভু কৃষ্ণের প্রিয় সখা এবং মন্ত্রী হচ্ছেন উদ্ধব। উদ্ধব বললেন, কৃষ্ণই বিরহকাতর ব্রজবাসীদের কাছে আমাকে পাঠিয়েছিলেন। আমাকে কৃষ্ণ তার মতো করে সাজিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর হাতের লেখা চিঠিও আমি নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি যখন বৃন্দাবনে পৌঁছলাম, সেখানকার গোপ-গোপীরা কৃষ্ণ এসেছে মনে করেই আমার রথের কাছে দলে দলে দৌড়ে দেখল, আমি কৃষ্ণ নই অন্য ব্যক্তি, অমনি তাঁদের মুখ শুকিয়ে গেল। আমি বললাম, আমি কৃষ্ণের সখা, আপনাদের কাছে কৃষ্ণই আমাকে পাঠিয়েছে। যখন আমি নন্দ মহারাজ ও যশোদা মাতাকে বললাম, আপনারা কেন কান্না করছেন, খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন, আপনারা দয়া করে স্থির হোন। কৃষ্ণ সাধারণ ব্যক্তি নন, উনি সবার পরমাত্মা, সবার হৃদয়ে রয়েছেন, তাঁর সঙ্গে আপনাদের ছাড়াছাড়ির কোনো প্রশ্ন নেই। উনি অন্তর্যামী, পরমেশ্বর। যেই একথা বলেছি অমনি নন্দ মহারাজ আমাকে বললেন, “হে উদ্ধব! তুমি বৃহস্পতির শিষ্য। তোমার ভাষণ তুমি কোনো মঞ্চে গিয়ে বা সভা-সমিতিতে গিয়ে শুনাতে পারো। আমাদের কাছে এসব বড় বড় প্রবচন দিতে হবে না। সে পরমাত্মা, অন্তর্যামী ওসব কথা আমরা মানি না। সে আমাদের  পুত্র। তাকে না দেখে আমরা থাকতে  পারছি না। আমাদের বুক ফেটে যাচ্ছে! আর তুমি কিনা বড় বড় তত্ত্ব উপস্থাপিত করছ, তোমাকে তত্ত্ববুলি আওড়াতে বুঝি কৃষ্ণ এখানে পাঠিয়েছে?”

উদ্ধব বললেন, “নন্দ মহারাজের সেই সব বকা খেয়ে আমি বিরহিনী রাধারানী ও অন্য গোপীর কাছে এলাম। তাঁদের সান্ত¦না দেওয়ার জন্য চিঠি পড়িয়ে শুনাতে লাগলাম। কিন্তু একটা ভ্রমর রাধারানী পায়ের কাছে এসে গুনগুন করছিল। তাকে দেখে রাধারানী বললেন, “আহা কালোমণি! এত গুঞ্জন করে আমার মন ভুলানোর দরকার নেই। তুমি তোমার বন্ধুর মতো কালো, তুমিও তাঁর মতো কপট। যাও চলে যাও, তোমার বন্ধুর সঙ্গেই থাকো। এখানে আমার কাছে গুঞ্জন করে বেশি ভাব দেখাতে হবে না। প্রকৃতপক্ষে রাধারানী সেই ভ্রমরকে বলছিলেন না, আমাকেই বলছিলেন। এভাবে তাঁর কাছেও ভালো রকমে বকা খেলাম। আমি তাদের কারও মনের গতি ধরে রাখার মতো কোনো বুদ্ধি খুঁজে পেলাম না। মনে হচ্ছিল কৃষ্ণ ছাড়া তারা আর বাঁচবে না। তখন আমি ব্রজের মাটিতে প্রণাম জানিয়ে তাঁদের চরণধূলি কামনা করেই চলে এসেছি।” তারপর আমি কৃষ্ণকে কাঁদতে কাঁদতে বললাম, হে কৃষ্ণ! তুমি আজ কিবা কালকেই বৃন্দাবনে যাও। না হলে তাঁরা বাঁচবে না। কিন্তু কৃষ্ণ নানা কাজে এত ব্যস্ত যে, আজ বহু বছর কেটে গেল, বৃন্দাবনে গেল না। হায়, তাদের কাছে আমি আর যেতে পারব না। বহু বছর অতীত হলো। আজ আবার বলতে হবে, কৃষ্ণ আসছে তোমরা দুঃখ করো না, প্রস্তুত হও। এই সব কথা তারা বিশ্বাস করে না। আমিও আর সেই কথা বলতে পারব না।   
তখন কৃষ্ণের বোন সুভদ্রা বললেন, ওরা যদি কেউ না যায়, তবে আমিই যাব। আমি রথে করে দ্রুত গিয়ে নন্দ ভবনে পৌঁছিয়েই মা যশোদার কোলে বসব। আর বলব, মা মা, দাদা আসছে, তুমি তাকে অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুত হও। আমি এভাবে অন্য সবাইকেও বলতে থাকব। আমাকে নিশ্চয়ই কেউ অবিশ্বাস করবে না। 


সেই সময় বলরাম বললেন, সুভদ্রা যদি যায়, তবে আমি যেহেতু রাস্তা জানি তাই আগে আগে আমি যাব। সুভদ্রা আমাকে অনুসরণ করবে। সে  ঘরে ঘরে সব মেয়েদের বলবে, আর আমি বাইরে বাইরে সব পুরুষদের বলব। তাহলে তারা সবাই প্রস্তুত হয়ে যাবে আর আমাদের পেছনে পেছনে কৃষ্ণকে ধরাধরি করে রথে করে অন্যরা চলুক।
বলরামের রথ দ্রুত আগে আগে চলতে লাগল। তার পেছনে সুভদ্রার রথ চলতে লাগল। কিন্তু অসুস্থ কৃষ্ণকে চাঙদোলা করে সেবকেরা বেশ ধীরে ধীরে রথের উপরে তুললেন। কৃষ্ণের রথ একটু পরে যাবে।

ব্রজভূমির তোরণ দ্বারে বলরামের রথ এসে দাঁড়ালো। ভেতরের দিকে রথ যাওয়ার মতো পরিস্থিতির সুবিধা নেই। কেননা লোকেরা যেন মৃতপ্রায় যত্রতত্র পড়ে আছে। বলরাম সামনের দিকে তাকিয়ে চিন্তা  করতে লাগলেন, এটা সত্যি বৃন্দাবন তো? গাছগুলোর সবুজ শ্যামল ভাব নেই। গরুগুলো চরছে না। পাখিগুলো ডাকছে না। মানুষগুলো মরার মতো পড়ে আছে। চারদিক কেমন রুক্ষ খাঁ খাঁ করছে। বলরামের মাথা ঘুরে যায়। ব্রজবাসী গোপগোপী মা-বাবা সখাসখীরা কেউ বেঁচে আছে কিনা, সে বিষয়ে প্রবল সন্দেহ জাগলো। বলরামের অঙ্গে বিকার শুরু হলো। তাঁর চোখগুলো বড় বড় হয়ে গেল, হাত-পা যেন গুটিয়ে গেল। তিনি যেন কাঠের মূর্তির মতো নিশ্চল হয়ে রইলেন।
দাদার রথ কেন এগিয়ে যাচ্ছে না, কেন দাঁড়িয়ে আছে, এই চিন্তা করে সুভদ্রার রথ দ্রুত এগিয়ে এলো। কিন্তু সুভদ্রাদেবী যখন দেখলেন, এই ব্রজভূমি যেন শ্মশানের মতো রূপ ধারণ করেছে, তখন তাঁরও মাথা ঘুরে যায়। ব্যাকুল হয়ে চিন্তা করলেন, আমি মা যশোদার কোলে বসে মাকে জড়িয়ে ধরে কিছু বলবো বলে মনে করেছিলাম সেই মা-বাবা আদৌ বেঁচে আছে তো? সুভদ্রারও অঙ্গবিকার শুরু হয়ে গেল। চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল, হাত-পা সংকুচিত হলো। কাঠের মূর্তির মতো নিশ্চল হয়ে রইলেন। 
বৃন্দাবনের দশা এরকম কেন? নিধুবনে শ্রীরাধারাধী পড়ে আছেন। ললিতা, বিশাখা তাঁরা নাকে তুলো দিয়ে দেখছেন, শ্বাস-ক্রিয়া সম্পূর্ণ বন্ধ। হৃৎস্পন্দনও নেই। সেই দুঃসংবাদ ছড়িয়ে পড়া মাত্রই বৃন্দাবনের যে যেখানে ছিল সেইখানেই অচৈতন্য হয়ে পতিত হলো। রাধারানী মারা গেছেন। এই কথা শোনামাত্রই লোকসব মৃতপ্রায় অবস্থাপ্রাপ্ত হলো।

এতদিন কৃষ্ণবিরহে সবাই অত্যন্ত দুঃখী থাকলেও সবার অন্তরে একটা আশা ছিল যে, রাধারানী যখন বৃন্দাবনে আছেন, তখন কৃষ্ণ অবশ্যই এখানে আসবেন, সেই আশায় ব্রজবাসী প্রাণধারণ করেছিলেন। কিন্তু রাধারানী চলে গেছে, এই খবরে সমস্ত আশা সম্পূর্ণ ব্যর্থ মনে করেই সবাই মূর্ছিত হয়ে পড়লো। কৃষ্ণগত প্রাণ ব্রজবাসীদের কী মর্মান্তিক দুর্দশা! 
দুঃসংবাদ শুনে যাবট থেকে আয়ান ঘোষ, তার মা জটীলা দেবী এবং বোন কুটিলা ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে এলো নিধুবনে। আয়ান কাঁদতে কাঁদতে রাধারানীর দুই চরণ স্পর্শ করে বলতে লাগলেন, “হে রাধে! আজ অত্যন্ত দুঃখ পেয়ে আমি তোমাকে একটা কথা বলছি, সেই কথা শুনে তুমি জেগে ওঠো। এতদিন যে কথা কাউকে বলিনি, কেননা গোপন রাখতে নির্দেশ ছিল, আজ সেই কথা বলছি। হে রাধা! তুমি হচ্ছ শ্রীকৃষ্ণের নিত্য স্ত্রী। তুমি আমার নিত্য-পূজনীয়। পূর্ব জন্মে তপস্যার ফলে তোমাকে আমার ঘরে গৃহিনীরূপে মাত্র পেয়েছি। কোনোদিন তোমাকে আমি স্পর্শও করিনি। আজ এই প্রথম তোমার চরণ র্স্পশ করে তোমার কাছে এই প্রার্থনা করছি, হে কৃষ্ণপ্রিয়া! দয়া করে তুমি জেগে ওঠো।”
এই বলে কাঁদতে কাঁদতে আয়ান ঘোষ যেই সরে গেল। কুটিলা এসে বলতে  লাগলেন, “হে রাধে! আমি তোমাকে অনেক কুকথা বলেছি, কিন্তু তুমিই ব্রজের মহান সতী বলে প্রমাণ দিয়েছ। ব্রজরাজের ছেলের যখন প্রবল জ্বর হয়েছিল, তখন এক জ্যোতিষী বৈদ্য বলেছিল, শতছিদ্র যুক্ত কলসিতে করে যমুনা থেকে যদি কোনো সতী নারী জল নিয়ে এসে নন্দভবনে তাঁর পুত্রকে ¯œান করিয়ে দিতে পারবে, তাহলে পরিপূর্ণরূপে শ্রীকৃষ্ণ সুস্থ হয়ে যাবে, সেক্ষেত্রে সবাই আমাকে জল আনতে বলেছিল, নন্দ মহারাজের একান্ত অনুরোধে আমি জল আনতে গিয়ে হার মেনেছি, কিন্তু আমার সেই লজ্জা ও দুঃখ থেকে তুমিই আমাকে রক্ষা করেছো। তুমি আমাকে ক্ষমা করো, আমি তোমার চরণধূলি মাথায় নিলাম, তুমি জেগে ওঠো।”
তারপর জটিলা এসে রাধার চরণের ধূলি মাথায় নিয়ে বলল, “আমি তোমাকে প্রচুর আঘাত দিয়েছি। তুমি ক্ষমা করো। আমি তোমাকে কলঙ্কিনী বলেছিলাম, কিন্তু তুমি তা নও। বরং আমারই বদনাম বেড়েছে। আজ তোমার চরণধূলি মাথায় নিয়ে আমি ক্ষমা চাচ্ছি। দয়া করে তুমি জেগে ওঠো।” 
রাধারানী মারা গিয়েছেন, শৈব্যার কাছে এমন দুঃসংবাদ পেয়ে বিপক্ষীয়া সখী চন্দ্রাবলী ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে এসে রাধারানীর কাছে আকুলভাবে প্রার্থনা করতে লাগল, “হে রাধে! শ্যামসুন্দর কৃষ্ণ কখনও আমার নয়, সে তোমারই। তুমি এভাবে চলে যেও না। আমি ভালোভাবেই জানি, এই কৃষ্ণকে আমি পেতে পারব- কেবল তুমি আছ বলে। তুমি যদি না থাকো তবে কৃষ্ণকে আমি কোনোদিন পাবো না। তুমি আমাকে রক্ষা কর। তুমি সত্ত্বর জাগো।”

এভাবে একে একে বহুজন রাধারানীর উদ্দেশে প্রর্থনা করতে করতে কাঁদতে লাগলেন। ললিতা, বিশাখা, যাদের সাথে চন্দ্রাবলী কথা বলতেন না, সেই চন্দ্রাবলী তাদেরকে এবং নিজ সহচরীদের বলতে লাগলেন, রাধার কাছে জোড়ে জোড়ে কৃষ্ণ নাম কর। অন্য উপায় নেই।
সমগ্র ব্রজের মধ্যে কত লোক মূর্চ্ছিত হয়ে পড়ে আছে। আর নিধুবনের মধ্যে কৃষ্ণনাম মাটিতে আকাশে বাতাসে অনুরণিত হতে লাগল। ধীরে ধীরে ঘুম থেকে জেগে উঠার মতো কৃষ্ণপ্রেয়সী রাধা জেগে উঠলেন। কৃষ্ণকে দর্শনে না পেয়ে রাধারানী আবার অসুস্থ হয়ে পড়বে এই জেনে যোগমায়া দেবী সবার অলক্ষ্যে তৎক্ষণাৎ কৃষ্ণকে রাধারানীর কাছে নিয়ে এলেন। হে কৃষ্ণ, রাধাকে দর্শন কর- যেইমাত্র বললেন, কৃষ্ণ চোখ মেলে তাকালেন, সামনেই রাধা। তারপর সেখানে সমস্ত কৃষ্ণপ্রিয়া গোপীগণ, সখা-সখীগণ রাধাকে দর্শন করে আনন্দে উৎফুল্ল হলেন। আকাশ থেকে বহু দিব্য বিমান এলো। তাঁরা বিমানে করে গোলোকধামের দিকে প্রস্থান করলেন। কৃষ্ণের আর একটি প্রকাশ রইল রথের উপরে।

আরও কিছু ব্রজবাসী যারা ছিলেন, যোগমায়া দেবী তাঁদের জাগালেন। তারা খবর পেলেন কৃষ্ণ এসেছে। বৃন্দাবনে প্রবেশের পর প্রথমেই পড়বে মাসির বাড়ি। মাসির নাম অর্ধাসনী দেবী। রথে করে কৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রাকে দেখে তিনি আনন্দে আত্মহারা হলেন। অত্যন্ত আনন্দে তাদের ঘরে নিয়ে পিঠে-পানা খাওয়ালেন। অন্যরা মাসির বাড়িতে এসে ভিড় করলেন। সকলে কৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রাকে দর্শন করে আনন্দিত হলো। সবার ইচ্ছে কৃষ্ণ বলরামকে তাদের নিজ নিজ বাড়িতে নিয়ে যাবে, কিন্তু মাসি কৃষ্ণ বলরামকে ছাড়তে চান না।


এদিকে দ্বারকাপুরীতে রাণীগণ চিন্তিত হলেন। তাঁরা ভাবতে লাগলেন, যে ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে থেকেও সবসময় শয়নে, স্বপনে, ভোজনে, জাগরণে বৃন্দাবনবাসীর কথা ভেবে উতলা হয়, সে এখন বৃন্দাবনে ফিরে গিয়েছে, সেই ব্যক্তিটি কি আর কখনও আমাদের কাছে ফিরে আসবে বলে মনে হয়? হায়, আমরা আমাদের প্রভুকে হারালাম! সত্যভামা দেবী বলতে লাগলেন, “এখানে এভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে থাকলে আমরা কখনও শান্তি পাবো না। আমরা যদি কুণ্ঠিত হতে না চাই, তবে এক্ষুণি বেরিয়ে পড়ি এবং ওদের রথ যেখানেই থাকুক সেখান থেকেই জোর করে ধরে নিয়ে আসি। আর কোনও কথা নয়।
রানীদের রাগ রাগ ভাব। তাঁরা এসে দেখলেন মাসির বাড়িতে মেলা বসেছে। কৃষ্ণ, বলরাম, সুভদ্রা বেশ আনন্দে আছেন। রানীরা বললেন, ঢের হয়েছে, আর নয়। এখন গিয়ে তোমরা বস। আমরা তোমাদের নিতে এসেছি।
কৃষ্ণ-বলরাম দেখলেন, রানীরা সকলে এসে গেছেন। ব্রজবাসীর কেউ কেউ বলছেন কৃষ্ণ এখানে থেকে যাবে। আমাদের বাড়িতেই আমরা তাদের নিয়ে যাবো। তখন রানীরা এমন ভাব দেখাচ্ছেন যেন ব্রজবাসীর সঙ্গে যুদ্ধ করতেও তারা প্রস্তুত। কোনো কথা রানীগণ শুনতে চাচ্ছেন না।
তারা ব্রজবাসীর সঙ্গে বচসা করতে পারেন এই আশঙ্কায় কৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রা তাড়াতাড়ি শান্তভাবে রথে গিয়ে বসলেন। রানীরা রথ টেনে নিয়ে যেতে লাগলেন। 
এদিকে ব্রজবাসীগণ মন্তব্য করতে লাগলেন, কী ব্যাপার, আমাদের বাড়ির দিকে রথ আসবে, রথ কোন দিকে যাচ্ছে? অন্যেরা কেউ বললেন রথ উল্টোদিকে যাচ্ছে। তারা তাদের লোককে নিয়ে যাচ্ছে।
যদিও মাসির বাড়িতে সকলে কৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রাদেবীর সেবা-সান্নিধ্য লাভ করে আনন্দিত হয়েছিলেন, তবুও অন্তরে একটি আশা পোষণ করে মিনতি করতে লাগলেন, হে কৃষ্ণ তুমি কৃপা কর, তোমাকে যেন আমরা আবার দেখতে পাই। আমরা যে তোমাদের ছাড়তে চাই না। তাঁদের প্রতি কৃষ্ণ, বলরাম, সুভদ্রা আশিস হস্ত দেখিয়ে আশ্বাস দিলেন যে, তোমাদের ইচ্ছে পূর্ণ হবে।
-সনাতন গোপাল দাস ব্রহ্মচারী

0 Comments