-->

বৈষ্ণব সঙ্গলাভের উপকার -শ্রীল জয়পতাকা স্বামী মহারাজ

বৈষ্ণব সঙ্গলাভের উপকার

শ্রীল জয়পতাকা স্বামী মহারাজ
বহু সৌভাগ্যের ফলে ভগবানের কৃপায় জীবের সংসার-বাসনা দুর্বল হয়ে পড়ে; তখন স্বাভাবিকভাবেই সাধুসঙ্গের স্পৃহা জন্মে। সাধুসঙ্গে কৃষ্ণকথা শ্রবণ হতে শ্রদ্ধার উদয় হয়। তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্য হচ্ছে বৈষ্ণবগণের শ্রীমুখ হতে কৃষ্ণকথা শ্রবণ। 
hksamacar

শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর মহাশয় তাঁর উপদেশাবলীতে গেয়েছেন,
তীর্থফল সাধুসঙ্গ সাধুসঙ্গে অন্তরঙ্গ
শ্রীকৃষ্ণভহন মনোহর।
যথা সাধু, তথা তীর্থ, স্থির করি নিজ-চিত্ত,
সাধুসঙ্গ কর নিরন্তর ॥
যে তীর্থে বৈষ্ণব নাই,  সে তীর্থেতে নাহি যাই,
কি লাভ হাটিয়া দূরদেশ।
যথায় বৈষ্ণবগণ  সেই স্থান বৃন্দাবন
সেই স্থান আনন্দ অশেষ ॥

ভগবদ্ভক্তির নয়টি বিধির মধ্যে শ্রবণ হল প্রথম পদ্ধতি। শ্রীল প্রভুপাদ এই শ্রবণের বিশেষ গুরুত্ব দিতেন, তাই পৃথিবীর প্রতিটি কৃষ্ণভাবনাময় মন্দিরে সকালে এবং সন্ধ্যায় গীতা-ভাগবত পাঠের ব্যবস্থা করেছিলেন। এই কৃষ্ণভাবনাময় আন্দোলে আমরা বহু নিষ্ঠাবান, সমর্পিতপ্রাণ এবং ভগবদ্ভক্তি অনুশীলনরত বৈষ্ণবদের বিপুল আশীর্বাদ পেয়ে থাকি। তাঁরা শুদ্ধভাবে ভগবদ্ভক্তি অনুশীলনের চেষ্টা করে চলেছেন।শ্রীল রূপ গোস্বামী উপদেশামৃত গন্থে বলেছেন যে, ভগবদ্ভক্তের সান্নিধ্য অর্জন করা কৃষ্ণভাবনায় অগ্রসর হওয়ার পথে ষড়বিধ পন্থার অন্যতম। এই সান্নিধ্যের সুযোগ আমাদের গ্রহণ করা দরকার। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, শ্রীমদ্ভাগবত এবং কৃষ্ণভাবনা সম্পর্কে বৈষ্ণবগণ যেসকল প্রবচন এবং সারগর্ভ আলোচনা করে থাকেন, সেগুলো নিয়মিত শ্রবণ করতে হবে। ঠিক যেমন অবৈষ্ণবদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করতেও নিষেধ করা হয়ে থাকে, তেমনি বৈষ্ণগণের কথা শুনতেও পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে।

যখনই আমি শুনতে পাই যে, আমার গুরুভ্রাতাগণ তাঁদের প্রবচন সভায় নানা উপলব্ধির কথা বুঝিয়ে বলছেন তা শুনে সর্বদাই আমার আত্মদর্শন প্রসারিত হয়ে উঠে। কৃষ্ণভাবনা অনুশীলনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এবং নতুন পরিম-ল বা নতুন অন্তর্দৃষ্টি এনে দেয় আমাদের মাঝে- যা হয়তো আমি খেয়াল করিনি কিংবা একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তা লক্ষ্য করতে পারিনি। তাছাড়া এতে পরিশুদ্ধি লাভ হয়। অতএব এই বিষয়টি নিয়ে আমার সমস্ত অনুগামীদের বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই যে, বৈষ্ণবগণের কাছ থেকে, বিশেষভাবে যারা কৃষ্ণভাবনায় অনেক অগ্রণী হয়ে রয়েছেন, তাঁদের কাছ থেকে কিছু শোনার প্রয়োজন আছে।

ভগবদ্ভক্ত শ্রীকৃষ্ণের খুব প্রিয়, আর শ্রীকৃষ্ণও ভক্তদের পরম প্রিয়। ভক্ত সর্বদাইি শ্রীকৃষ্ণের সেবা করছেন, আর শ্রীকৃষ্ণও সেবা করছেন তাঁর ভক্তম-লীর। শ্রীমদ্ভাগবতের নবম স্কন্ধের চতুর্থ অধ্যায়ের ৬৩ থেকে ৬৮ নং শ্লোকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণু দুর্বাসা মুনিকে বলেছেন, কিভাবে তাঁর নিজের সাথে তাঁর ভক্তদের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রয়েছে। পরমেশ্বর ভগানের কাছে ভক্তগণ এমনই প্রিয় যে, ভগবান এই কথা বারবার শাস্ত্রসমূহে ঘোষণা করেছেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভক্তগণ বিশ্বব্রহ্মা-কে পারমার্থিক জ্যোতিতে উদ্ভাসিত করে রেখেছেন। ঠিক যেমন সূযং তার বিচ্ছুরিত কিরণালোকের মাধ্যমে বিশ্বব্রহ্মা-কে জ্যোতির্ময় করে রেখেছে। এ কথা শ্রীমদ্ভাগবতে (১১.২৬.৩৪) শ্রীকৃষ্ণ-উদ্ধব-সংবাদে উক্ত হয়েছে-

সন্তো দিশন্তি চক্ষুংষি বহিরর্কঃ সমুত্থিতঃ।
দেবতা বান্ধবাঃ সন্তঃস্ত আত্মহমেব চ ॥
“আমার ভক্তগণ দিব্যচক্ষু দান করেন, যেক্ষেত্রে সূর্য কেবল বহিরঙ্গা দৃষ্টিক্ষমতা এনে দেয়, আবার সেটিও যখন সে আকাশে অবস্থান করে। আমার ভক্তবৃন্দ মানুষের প্রকৃত আরাধ্য দেবম-লী এবং প্রকৃত পরিবার- গোষ্ঠী; তারাই মানুষের স্বরূপাত্মা, শেষ পর্যন্ত তারা আমা হতে অভিন্ন।”

তাই বৈষ্ণবগণের নিকট থেকে আমরা শ্রীকৃষ্ণভাবনার অন্তরঙ্গা জ্ঞানালোক লাভ করতে পারি। ভক্ত-সান্নিধ্য লাভের মূল্যায়ন কে করতে পারে! বৈষ্ণবগণের নিকট হতে শ্রবণ করা এবং বৈষ্ণবগণের সেবা করার এমনই মাহাত্ম্য। যখন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং তাঁর ভক্তগণের সেবা করে থাকেন, তাহলে কোন উৎসাহী ভক্তের কথা আর কি বলার আছে! বৈষ্ণব-ভক্তদের সেবা করা কতই না জরুরী। ভগবান শ্রীবিষ্ণু আগেই বলেছেন, “ভক্তদের কথা আর কি বলব, এমনকি যারা আমার ভক্তেরও সেবক, তারাও আমার অধিক প্রিয়।”

শ্রীল প্রভুপাদ বারবার নরোত্তম দাস ঠাকুরের ভক্তিগীতিটি উদ্ধৃতি করে বলতেন, যেখানে তিনি গেয়েছেন, “ছাড়িয় বৈষ্ণব সেবা, নিস্তার পেয়েছে কেবা?”- ভক্তের ভক্ত হতে না পারলে কখনও জড়জগতের বন্ধন হতে মুক্ত হওয়া যায় না। (ভা. ৯.৪.৬৩ তাৎপর্য)
বাস্তবিকই পদ্মপুরাণে স্পষ্টরূপে বলা আছে যে, কেউ যদি পরমেশ্বর ভগবান শ্রীগোবিন্দের ভক্তের পূজা এবং সেবা পরিত্যাগ করে সরাসরি গোবিন্দের ভজনা শুরু করে দেয়, তাহলে তাকে ভগবানের ভক্ত বলে বিবেচনা করা হয় না।-
অর্চৈত্বতু গোবিন্দ তাধিয়নর্চায় তু যঃ।
ন স ভগবতো গেয়ঃ কেবলং দাম্ভিক স্মৃতিঃ।
তস্মাদ সর্বং প্রজত্মেন বৈষ্ণবান্ পূজায়েৎ সদা ॥
পরমেশ্বর ভগবানরে ভক্তরূপে তাকে গণ্য করা হবে না, যে ভগবানের শুদ্ধবৈষ্ণব ভক্তগণের আরাধনা পরিত্যাগ করেছে, এমনকি যদি সে সরাসরি গোবিন্দের ভজনাও করে থাকে। ঐরকম মানুষকে বৃথা অহংকারী এবং উদ্ধত বলেই জানতে হবে। অতএব অতি সযতেœ ও মনোযোগ সহকারে মানুষকে নিয়ত বৈষ্ণবগণের আরাধনা করতে হবে। 
পদ্মপুরাণ, উত্তর
প্রহ্লাদ মহারাজ তাঁর পিতা হিরণ্যকশিপুকে বলেছেন-
নৈষাং মতিস্তাবদুরুক্রমাঙ্ঘ্রিং
স্পৃশত্যনর্থাপগমো যদর্থঃ।
মহীয়সাং পাদরজোহভিষেকং
নিষ্কিঞ্চনানাং বৃনত যাবৎ ॥
“যেসকল মানুষের জড়জাগতিক জীবনের প্রতি অত্যধিক প্রবণতা রয়েছে, তারা যদি জড়-কলুষ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত কোন বৈষ্ণবের চরণকমলরেণু তাদের সর্বাঙ্গে লেপন করতে না পারে, তবে অসাধারণ কার্যকলাপের মহিমান্বিত সেই পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি তারা আসক্ত হতে পারবে না। শুধুমাত্র শ্রীকৃষ্ণভাবনায় মগ্ন হয়ে এভাবে পরমেশ্বর ভগবানের পাদপদ্মে ভগবানের পাদপদ্মে আশ্রয় গ্রহণ করেই জড়কলুষতা থেকে মুক্ত হতে পারে।” 
ভা. ৭.৫.৩২
ব্রহ্মজ্ঞ জড়ভরত মহারাজ রহুগণকে বলেছেন-
রহুগনৈস্তত্তপসা ন যাতি
ন চেজ্যয়া নিবপণাদ্ গৃহাদ্বা।
নচ্ছন্দসা নৈব জলাগ্নিসূর্যৈ-
বিনা মহৎপাদরজোভিষেকম্ ॥
“হে মহারাজ রহুগণ! মহাভাগবতের চরণরেণুর দ্বারা অভিষিক্ত না হলে, কখনই পরমতত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করা যায় না। ব্রহ্মচর্য পালনের দ্বারা, গার্হস্থ্য-জীবনের বিধিবিধান কঠোর নিষ্ঠার সঙ্গে পালনের দ্বারা, বানপ্রস্থ আশ্রমে গৃহত্যাগ করার দ্বারা, সন্ন্যাস আশ্রম অবলম্বনের দ্বার কিংবা শেিতর মধ্যে জলমগ্ন হয়ে অথবা গ্রীষ্মে অগ্নি পরিবেষ্টিত হয়ে বা প্রখর সূর্যকিরণে অবস্থান করে তপস্যা করার দ্বারা তাঁকে জানা যায় না। পরমসত্যকে হৃদয়ঙ্গম করার অন্য পন্থা থাকলেও মহাভাগবতের কৃপার প্রভাবেই কেবল পরমসত্য প্রকাশিত হন।” 
ভা. ৫.১২.১২

পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুদ্ধভক্তগণের; ভগবানের সেবায় সমর্পিতপ্রাণ নিষ্ঠাবান ভক্তগণের ভগবদ্ভক্তির মাহাত্ম্য সম্পর্কে অসংখ্য উল্লেখ শাস্ত্রে আছে। অবশ্যই আমি চাই আমার সকল অনুগামীরা ভগবানের ভক্তবৃন্দের চরণকমলের সেবা করে, এই যে বিশেষ কৃপালাভ করা যায়, সেই সুযোগটি তারা গ্রহণ করবে। দীক্ষাগুরুর প্রতি সেই ধরনের বিশ্বান এবং ভালোবাসা প্রত্যেক শিষ্যেরই আছে বা থাকা উচিত। তারা এভাবেই গুরুদেবের সেবা পূজা করতে চায়। অবশ্য গুরুদেবের সেবা-পূজা করা আর অন্যান্য বৈষ্ণবের অশ্রদ্ধা করা সম্পর্কে শাস্ত্রসমূহে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। রামানুজাচার্য এক বিত্তবান শিষ্যের বাড়িতে যেতে আপত্তি করেছিলেন, কারণ তাঁর গুরুভ্রাতাদের সে খুব ভালোভাবে সেবা করেনি। গুরুদেবের প্রতি কোন শিষ্যের বিশ্বা, বিশেস শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা থাকাটি মোটেই দোষের নয়। তবে নিজের গুরুদেবের প্রতি বিশেষ ভালোবাসা আছে বলে ভগবানের লৈবষ্ণব-ভক্তদের প্রতি সেবা পরিত্যাগ করা উচিত নয়।

উন্নত বৈষ্ণব ভগবৎভক্তের কাছ থেকে শ্রবণ করা এবং তাঁদের সেবা করবার মাধ্যমে বিশেষ পরিশুদ্ধি  এবং কৃপালাভের সুযোগ ঘটে। আমি চাই না যে, আমার শিষ্যসমূহ তা থেকে বঞ্চিত থাকবে। তার গুরুই হলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের একমাত্র ভক্ত এবং অন্য কেই ভক্ত হতে পারে না- এমন ধারণা শুধুমাত্র কনিষ্ঠ অধিকারী ভক্তদেরই থাকে। আমি চাই আমার সমস্ত শিষ্য অবশ্যই অন্তত মধ্যম অধিকারি পর্যায়ে উন্নীত হবে এবং কেবল তাদের গুরুদেবের প্রতিই ভালোবাস এবং বিশ্বাস থাকবে তা নয়, বরং পরমেশ্বর ভগবানের সকল শুদ্ধভক্তদেরই শ্রদ্ধা-ভালোবাসা দিতে জানবে। বহু বৈষ্ণবের নিকট হতে শ্রবণ করার মাধ্যমে উপদেশ গ্রহণ করতে হলে ভক্তদের মধ্যে খানিকটা বিশেষ পরিণত মনোবৃত্তি থাকা বাঞ্ছনীয়। প্রচার সম্পর্কিত দর্শনভঙ্গির মধ্যে সামান্য মতভেদগুলো সহন করতে শিখতে হবে। দর্শনতত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে প্রত্যেক ভক্তের সামান্য কিছু মত-পার্থক্য বা গুরুত্বভেদ থাকতে পারে, তবে শ্রীকৃষ্ণের মর্যাদা বা মহিমা সম্পর্কে আর দর্শনতত্ত্বের পরম বিষয়াদি সম্পর্কে কোনো মতানৈক্য থাকা অনুচিত।

আমাদের চেতনাকে শ্রীকৃষ্ণভাবনাময় দর্শনতত্ত্বে পরিপূর্ণ করে তুলতে হবে এবং ভগবানের শুদ্ধভক্তদের কাছ থেকে তা শোনার থেকে আর কি ভাল পন্থা হতে পারে! সচরাচর আমাকে প্রবচন বা ভাষণ দিতেই হয়, কিন্তু আমি যখনই সুযোগ পাই কিছু শুনবার, তখন আমি অন্যান্য ভক্তগণের আলোচনা বা পর্যালোচনা থেকে বিপুল উদ্দীপনা এবং অন্তর্দষ্টি লাভ করে থাকি।

0 মন্তব্য