-->

শ্রীরামচন্দ্র এবং কুকুর কাহিনী


একবার শ্রীরাম রাজকার্যে অংশগ্রহণের জন্য দ্রুত রাজসভার উদ্দেশ্যে প্রস্থান করলেন, আর লক্ষ্মণকে বললেন, “রাজপ্রাসাদের দরজায় আগত আবেদনকারীদের নিয়ে আস।” লক্ষ্মণ শীঘ্র ফিরে এসে জানালেন, “হে রাজন, মনে হচ্ছে কোশল রাজ্যের কারো চাওয়ার কিছু নেই।” রামচন্দ্র তবুও জোর দিয়ে বললেন, “পুনরায় যাও এবং সতর্কতার সাথে খুঁজে দেখ। আমি সামান্যতম অমনোযোগিতার অভিযোগও শুনতে চাই না। কোনো প্রকার অধর্ম চিহ্নিত না হয়ে আমার রাজ্য চলতে থাকুক তা আমি চাই না।” পুনরায় বেরিয়ে এসে লক্ষ্মণ প্রাসাদের দরজায় একটি কুকুরকে বসে থাকতে দেখলেন। মাথা নত করে সে বসেছিল। লক্ষ্মণের দিকে তাকিয়ে কুকুরটি আর্তনাদ করে উঠল। লক্ষ্মণ জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কী হয়েছে? তুমি এখানে কেন এসেছ? ভীত হয়ো না, আমাকে সবকিছু বলতে পার।”
hksamacar

কুকুরটি বলল, “আমি রামচন্দ্রের কাছে সরাসরি সবকিছু বলতে চাই। তার শ্রীচরণপদ্ম ভয়শূন্য এবং তিনি আর্তদের আশ্রয়স্বরূপ।"
লক্ষ্মণ এরপর বললেন, “তোমার যদি কিছু বলার থাকে তাহলে তুমি সরাসরি রাজার কাছে তা বলতে পার।”
কুকুরটি আরো বলল, “আমি অতি নিচু কুলোদ্ভূত জীব। মন্দির, ব্রাহ্মণগৃহ এবং রাজপ্রাসাদে প্রবেশের অনুপোযোগী। রাজা সমস্ত ধর্মীয় রীতি-নীতির ধারক ও বাহক, তিনি সমস্ত দেবগণের প্রতিনিধি এবং সমস্ত জীবের শুভাকাক্সক্ষী। তাঁর বিশেষ অনুমতি ছাড়া আমি সেখানে যাওয়ার সাহস করতে পারছি না।”
লক্ষ্মণ বিষয়টি রামচন্দ্রকে জানালে, তিনি তৎক্ষণাৎ তাকে নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন। কুকুরটি অত্যন্ত বিনীতভাবে রামচন্দ্রের সামনে উপস্থিত হয়ে বলল, “হে প্রভু, রাজা পরমেশ্বর ভগবানের প্রতিনিধি। তাই তিনি সকল জীবের পালক। যখন অন্যরা শান্তিতে ঘুমায়, তখন রাজা জেগে থেকে প্রজাদের মঙ্গলের জন্য কাজ করেন। আবার যেহেতু সবকিছু তার ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল, তাই রাজা যদি অমনোযোগী হন, তাহলে প্রজারা অতি শীঘ্র বিনাশ প্রাপ্ত হয়। রাজা ধর্মীয় অনুশাসনের ধারক এবং সেজন্য তিনি অপশক্তিসমূহ বিনাশ করেন। যারা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলেন, তারা এ জীবনে এবং পরবর্তী জীবনেও শান্তি লাভ করেন। সে কারণে ধর্ম সংরক্ষণের জন্য রাজা অনেক পুণ্য অর্জন করেন। হে রামচন্দ্র, আপনি নীতিপরায়ণ রাজাদের আদর্শস্বরূপ। আমি আমার মস্তক আপনার চরণপদ্মে রেখে আপনার কৃপা ভিক্ষা চাই। আমি যা বলব তা শুনে আপনি ক্রুদ্ধ হবেন না।”
রামচন্দ্র কুকুরটিকে আশ্বস্ত করে বললেন, “তুমি নির্ভয়ে সবকিছু বল।”


এভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে কুকুরটি বলতে লাগল, “আমার কোনো দোষ না থাকা সত্ত্বেও সর্বথা-সিদ্ধ নামে একজন ভিক্ষুক ব্রাহ্মণ আমার মাথায় আঘাত করেছে।”
রামচন্দ্র তৎক্ষণাৎ তার লোক দ্বারা ব্রাহ্মণকে ডেকে আনলেন। এরপর সেই ব্রাহ্মণ তাঁর সামনে উপস্থিত হলে রাম বললেন, ‘‘তুমি কুকুরটিকে কেন আঘাত করেছ? সে কি দোষ করেছিলো? ক্রোধ একটি অতি ভয়ানক শত্রু। এটি অতি তীক্ষè ও ধারালো তরবারির মতো একজন মানুষের সদ্গুণাবলি কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলে। তাই জ্ঞানী ব্যক্তি তার চিন্তা, কথা এবং কার্যের দ্বারা ক্রোধ পরিত্যাগ করে এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকেন। হে ব্রাহ্মণ, আড়াল করার যত চেষ্টাই করা হোক না কেন, প্রকৃত পরিচয় কখনও ঢেকে রাখা যায় না। যারা কাম, ক্রোধ ও লোভের বেগ দমন করেতে পারেনি, তারা সর্বদাই তাদের অসৎ কার্য দ্বারা দুর্দশাগ্রস্ত হয়।”
ব্রাহ্মণটি উত্তরে বললেন, “আমি যখন ভিক্ষা করছিলাম, তখন এ কুকুরটিকে আমার পথ আগলে বসে থাকতে দেখে তাকে বলি, ‘সরে যাও।’ কিন্তু সে ধীরে উঠে দাঁড়াল তাই আমি তার মাথায় লাঠি দ্বারা আঘাত করি। আমি প্রচ- ক্ষুধার্ত ছিলাম, তাই খুব দ্রুত রেগে গিয়েছিলাম। হে রাজন, আমি আমার ভুল স্বীকার করছি। আপনি আমার যথার্থ শাস্তি বিধান করুন। শুধু নারকীয় জীবনে পতিত হওয়ার হাত থেকে আমাকে রক্ষা করুন।”


রামচন্দ্র তাঁর মন্ত্রীদের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কি শাস্তি দেওয়া যায় ওর? এর বিচার করতেই হবে, কেননা অন্যায়কারীর যথার্থ শাস্তি ছাড়া অন্য কোনো কিছ্রু দ্বারাই প্রজাদের মনে বিশ্বাস জাগানো যায় না।”
ধর্মীয় অনুশাসনের জ্ঞাতা, ভৃগু, বশিষ্ঠ, কশ্যপসহ অন্য ঋষিগণ বললেন, “একজন ব্রাহ্মণ কখনই শাস্তিযোগ্য নয়। তা ধর্মীয় অনুশাসন সম্বন্ধে যথার্থ জ্ঞানী ব্যক্তিদের কথা। তবুও, হে রামচন্দ্র, আপনি পরম বিচারক, আপনি জগতের প্রভু। আপনি স্বয়ং ভগবান বিষ্ণু। তাই, আপনার বাক্যই চিরন্তন ধর্ম।”
কুকুরটি কথার মাঝখানে বলে উঠল, “হে রাজন, আপনি আমাকে বলেছিলেন, আমি তোমার জন্য কি করতে পারি। আপনি যদি আমাকে সত্যিই সন্তুষ্ট করতে চান তাহলে এ ব্রাহ্মণকে কালঞ্জর মঠের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করুন।”


রামচন্দ্র কুকুরটির মনোবাসনা পূরণ করলেন। এভাবে উৎফুল্ল ব্রাহ্মণ সর্বথা-সিদ্ধ একজন আধ্যাত্মিক গুরু বা নেতা হওয়ার সম্মান লাভ করলেন। তাকে সুন্দরভাবে সাজানো একটি হাতির পিঠে বসানো হলো। মন্ত্রীরা অত্যন্ত হতাশ হয়ে এই কার্যের বিরোধিতা করে বললেন, “হে রাজন, একে শাস্তি বলে গণ্য করা যায় না। ব্রাহ্মণকে কোনো লজ্জাজনক পরিস্থিতির  মধ্যে না ফেলে, আপনি তাকে একটি সম্মানীত পদ দান করলেন।”
রামচন্দ্র বললেন, “আপনার কর্মের সূক্ষ্ম জটিলতা সম্পর্কে জানেন না, কিন্তু এ কুকুরটি তা জানে।”


কুকুরটি তখন ব্যাখ্যা করে বলল, “গত জন্মে আমি কালঞ্জর মঠের প্রধান ছিলাম। তখন ব্রাহ্মণ ও দেবতাদের পূজা করেছিলাম। আমি অনেক পবিত্র কার্য অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পালন করেছিলাম এবং দাস-দাসীদের ভালোভাবে পরিচালনা করেছিলাম। এত সতর্কতা সত্ত্বেও, কোনো অজানা ত্রুটির কারণে আমি আমার পরবর্তী জন্মে একটি কুকুর হয়ে জন্মগ্রহণ করেছি। এখন এই ব্রাহ্মণটির কথা বিবেচনা করুন, যে এমনকি তার ক্রোধ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করতে অসমর্থ। সে নিশ্চিত একজন আধ্যাত্মিক নেতা হওয়ার অনুপযোগী। এ ধরনের একটি পদ অধিগ্রহণে তার প্রগল্ভতার জন্য সে তার সাতকুলকে অধঃপতিত করবে। যে ব্যক্তি তার ক্রোধ সংবরণ করতে পারে না, তাকে কীভাবে ব্রাহ্মণ, গাভি ও বিগ্রহ সেবার দায়িত্বভার অর্পণ করা যায়। যে ব্রাহ্মণ, দেবতা, নারী ও শিশুদের নিকট থেকে কোনো কিছু অপহরণ করে, সে নিশ্চিত অধঃপতিত হবে। এমনকি দেবতা ও ব্রাহ্মণের কাছ থেকে কোনো কিছু চুরির ভাবনাও একজনকে নিুতর নরকে নিক্ষেপ করে।”
এ কথা বলে কুকুরটি হঠাৎ হারিয়ে গেল। রামচন্দ্র এবং অন্যরা চোখ বড় বড় করে বসে রইলেন। পূর্বে উচ্চকূলে জন্মগ্রহণ করা সত্ত্বেও এ জীবটি রাজদরবার পরিত্যাগ করে খাদ্য ও জল গ্রহণ করা বন্ধ করে দিয়ে একটি উন্নত জন্ম লাভের বাসনায় দেহত্যাগ করে।
শ্রীল ভক্তি বিকাশ স্বামী মহারাজ

0 মন্তব্য