-->

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অসুর সংহার করেন নাকি উদ্ধার করেন?

krishna-ashur
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর আবির্ভাবের উদ্দেশ্য বিষয়ে ঘোষণা করে বলেছেন, ‘পরিত্রাণায় সাধুনাং’, যারা ভগবানের ভক্ত, সাধু, তাদের পরিত্রাণ করা, ‘বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্’, যারা সাধু নয়, উপরন্তু সাধু এবং শাস্ত্রের উপর অত্যাচার করে, তাদের বিনাশসাধন এবং ‘ধর্ম সংস্থাপন’, জীবের যে প্রকৃত ধর্ম কৃষ্ণভক্তি তা স্থাপন করা। কিন্তু প্রশ্ন হতে পারে, যিনি পরমেশ্বর ভগবান, তিনি কী চাইলেই ঐ অসুরদের মনোবৃত্তি পরিবর্তন করতে পারেন না? এর উত্তরে বলা হয়েছে, ভগবান সবাইকে কিছু ক্ষুদ্র স্বাধীনতা দিয়েছেন। জীব চাইলে এর ব্যবহার কৃষ্ণসেবাতেও করতে পারে, কৃষ্ণের বিরুদ্ধেও করতে পারে এবং এর ফলাফলও নিজেই ভোগ করে। এ স্বাধীনতা যদি না-ই থাকত, তবে যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কৃষ্ণভক্তি যাজন করছেন, সেটি আর স্বতঃস্ফূর্ত হতো না, রোবট বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো হতো। যাই হোক ভগবান যখন আসেন, তিনি অসুরদের নিধন করেন, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তিনি তাদের শত্রু। বরং তিনি সকলের পিতা এবং সকলের প্রতি সমদর্র্শী, সমভাবাপন্ন। ভগবানের এই আচরণ শত্রুতা বা হিংসাত্মক নয়, বরং তা ঐ সমস্ত অসুরদের জন্যই কল্যাণপ্রদ। ঠিক যেমন পিতা-মাতা তাদের সন্তানকে শাসন করেন- সেটিও সন্তানের মঙ্গলের জন্য।

শ্রীকৃষ্ণ তাঁর বাল্যলীলায় অসংখ্য অসুর বধ করেন এবং কীভাবে তাঁদের মঙ্গল সাধন করেন তা এখন তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

পুতনা বধ
কংসের নির্দেশে পুতনা নামক শিশুহন্তা ডাইনি ব্রজম-লে অসংখ্য শিশু হত্যা করে পরিশেষে নন্দ মহারাজের গৃহে কৃষ্ণকে বধ করতে আসে। পুতনা অতি সুন্দরী নারীর ছদ্মবেশ ধারণ করে নন্দ মহারাজের গৃহে প্রবেশ। কৃষ্ণকে হত্যা করার জন্য তার স্তনে মহাভয়ঙ্কর কালকূট বিষ লাগিয়ে এসেছিল। যেহেতু তার ছদ্মবেশী রূপে যশোদা মাতা প্রভৃতি সকলেই মুগ্ধ হয়েছিলেন, পুতনাকে তারা কৃষ্ণকে স্তন পান করাতে বাধা দেন নি। কিন্তু পুতনা ছয় মাসের কৃষ্ণকে হত্যা করতে এসে নিজেই নিহত হন। কৃষ্ণ পুতনার স্তন পান করার সাথে সাথে পুতনার প্রাণবায়ুও শুষে নেন।
কৃষ্ণ কিন্তু পুতনার প্রতি বৈরীভাবাপন্ন ছিলেন না। পুতনা যেহেতু শ্রীকৃষ্ণকে কোলে নিয়ে তাঁকে তার বুকের দুধ পান করতে স্তন দান করেন, তাই শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে মাতারূপে গ্রহণ করেন। তিনি পুতনাকে মাতৃপদ প্রদান করেন।
পুতনার পূর্বজন্মের ইতিহাস
পুতনার পূর্বজন্মের কাহিনীটি অত্যন্ত চমকপ্রদ। প্রহ্লাদ মহারাজের পৌত্র বলী মহারাজ তার জাগতিক গুরু শুক্রাচার্যের নির্দেশে স্বর্গ দখল করেন এবং ইন্দ্রত্বপদ পাকাপোক্ত করতে একশত অশ্বমেধ যজ্ঞ আয়োজন করেন। তখন দেবতাদের অনুরোধে ভগবান শ্রীবিষ্ণু বামন অবতার ধারণ করে বলী মহারাজের সব কিছু হরণ করেন। শ্রীমদ্ভাগবতে দেখতে পাই, যদিও দেবতারা বামনদেবের মাধ্যমে স্বর্গরাজ্য ফিরে পান, কিন্তু বলী মহারাজ তাঁর ভক্তির দ্বারা বামনদেবকে বশ করে নেন। এমনকি এখনও বলীমহারাজ বামনদেবের দ্বারা সুরক্ষিতভাবে সুতললোকে বাস করছেন।
এদিকে ভগবান বামনদেব যখন বলী মহারাজের নিকট আসেন তখন বামনদেবকে দর্শন করে মহারাজ বলীর ভগ্নী রত্নমালার হৃদয়ে বাৎসল্যভাব জাগ্রত হয় এবং তিনি তাকে সন্তান হিসেবে পাওয়ার বাসনা করেন। কিন্তু বামনদেবের দ্বারা বলীর সবকিছু হৃত হতে দেখে তিনি এই শিশুটিকেই বিষপানে হত্যা করার মনোবাসনা করেন। ভগবান যেহেতু তাঁর মনের ভাব জানতেন, তাই তিনি উভয়টিই গ্রহণ করলেন। কিন্তু ভগবানর কৃপা দেখুন! তিনি রত্নমালার বৈরীভাবকে কম গুরুত্ব দিয়ে তার বাৎসল্যভাবকেই অধিক গুরুত্ব প্রদান করলেন। তিনি শিশুঘাতিনী পুতনা হিসেবে তাকে বধ করলেন, কিন্তু পরিশেষে তাকে মা হিসেবেই গ্রহণ করলেন।

শকটাসুর বধ
কৃষ্ণ যখন প্রথম হামাগুড়ি দেন, নন্দ মহারাজ ও মা যশোদা সেই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে উত্থান উৎসবের আয়োজন করেন। এতে অসংখ্য ব্রাহ্মণ সমবেত হয়ে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করছিল। সর্বত্র আনন্দময় পরিস্থিতি। মা যশোদা কৃষ্ণকে স্নান করিয়ে সুন্দর বস্ত্র-অলঙ্কারে ভূষিত করে ব্রাহ্মণদের বেদপাঠ শ্রবণ করছিলেন। এসময় কৃষ্ণ ঘুমিয়ে পড়লে তিনি তাকে একটি থালা-বাসন ভর্তি শকট বা গাড়ির ছায়ায় শুইয়ে রেখে অতিথিদের যত্ন নিতে যান। কিন্তু হঠাৎ কৃষ্ণের নিদ্রাভঙ্গ হলে তিনি যখন দেখলেন তার মা থাকে রেখে চলে গিয়েছে, ছোট্ট কৃষ্ণ অভিমানবশত কাঁদতে কাঁদতে হাত-পা ছুড়তে থাকেন। আর একপর্যায়ে তার পদস্পর্শে গাড়িটি দূরে ছিটকে পরে ভেঙ্গে যায়।
এই শকটটি সাধারণ ছিল না। কংসের নির্দেশে শকটাসুর, যে ছিল এক ভয়ানক অসুর, সে কৃষ্ণকে বধ করতে সেখানে ঐ গাড়িতে প্রবেশ করে। পরিশেষে সে কৃষ্ণের পদস্পর্শে নিহত হলো।
শকটাসুরের পূর্বজন্মের ইতিহাস
পূর্বজন্মে শকট ছিল হিরণ্যাক্ষের পুত্র উৎকচ। অত্যন্ত শক্তিগর্বে উদ্ধত উৎকচ লোমশ মুনির আশ্রমে গিয়ে গাছপালা প্রভৃতি ভেঙে দিয়ে সবকিছু তছনছ করে দেয়। তখন লোমশ মুনি তাকে ভূতদেহ প্রাপ্ত হওয়ার অভিশাপ দেন, কেননা ভূতেরা মানুষের বাড়িঘর তছনছ করতে পছন্দ করে। কিন্তু তখন উৎকচ অতিশয় ভীত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলে মুনির হৃদয়ে দয়ার উদ্রেক হয়। তিনি উৎকচকে আশীর্বাদ করেন যে, বৈবস্বত মন¦ন্তরে দ্বাপর যুগে যখন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং অবতীর্ণ হবেন, তখন তাঁর পদস্পর্শে তার মুক্তি হবে। ততদিন সে বায়বীয় শরীর নিয়ে বিচরণ করতে থাকে।

তৃণাবর্ত বধ
একদিন নন্দ মহারাজের এক বছর বয়সের শিশুপুত্র কৃষ্ণকে হত্যা করবার উদ্দেশ্যে কংস তাকে গোকুলে পাঠায়। শিশু কৃষ্ণকে মা যশোদা ভূমিতে রেখে অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তখন সেই মায়াবী রাক্ষস ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় করলো। এভাবে কৃষ্ণকে ধূলিঝড়ের মধ্যে হরণ করে নিয়ে সে আকাশে উঠে গেল। তখন শিশু কৃষ্ণ তৃণাবর্তের গলা এমনভাবে চেপে ধরেছিল যে, তৃণাবর্ত কৃষ্ণের হাত ছাড়াতে পারল না। তার কাছে মনে হলো ঠিক যেন কোনো যাঁতাকল গলাটাকে চেপে রেখেছে। তৃণাবর্ত দম আটকে মারা গেল। এদিকে মা-বাবা ও গোকুলবাসীরা ঝড়ের মুখে কৃষ্ণকে খুঁজেই পাচ্ছিলেন না। তাঁরা উদ্বিগ্ন ছিলেন। তৃণাবর্ত মরে যেতেই ঝড় সম্পর্ণরূপে থেমে গেল। তখন তাঁরা দেখলেন একটি সুন্দর স্থানে শিশু কৃষ্ণও খেলা করছে আপন মনে। আর তার কাছাকাছি একটা রাক্ষসের মৃতদহ পড়ে আছে।
কে ছিল এই তৃণাবর্ত
পান্ডুদেশে সহস্রাক্ষ নামে এক ধর্মনিষ্ঠ ও অতিথি সেবাপরায়ণ প্রতাপশালী রাজা ছিলেন। একদিন তিনি নর্মদা নদীর তীরে বৃক্ষলতা পরিবৃত এক সুন্দর মনোরম স্থানে বহু সুন্দরী রমণীর সঙ্গে বিহার করছিলেন। তখন সেখানে মহামুনি দুর্বাসা আগমন করলেন। দুর্বাসাকে সবাই প্রণতি নিবেদন করে থাকেন। কিন্তু রাজা সহস্রাক্ষ সেদিন রমণীদের সঙ্গে আলাপে এত হাসাহাসি করছিলেন যে, দুর্বাসা মুনি তাঁর সামনে এসে পৌঁছালেও তিনি মুনিকে প্রণাম করেন নি। তিনি দুর্বাসার প্রভাব খেয়ালই করতে পারেননি। তখন মুনি দুর্বাসা রাজার বিষয়ে চিন্তা করলেন। তিনি সেই ধার্মিক রাজার জাগতিক আসক্তি মোচন করে পারমার্র্থিক উন্নতির কথা চিন্তা করলেন। তিনি রাজাকে অভিশাপ দিলেন, “রে দুমর্তি! তুমি রাক্ষস হয়ে যাও। কারণ, রাক্ষস জাতি কাউকে সম্মান দিতে পারে না। কাউকে পরোয়া করে না।” অভিশাপ শুনে রাজা সহস্রাক্ষ চমকে উঠলেন। তিনি দুর্বাসা মুনির পদতলে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন, “হে মহর্ষি, আমার অপরাধ ক্ষমা করুন। শাপ মুক্তি দিন।” দুর্বাসা বললেন, “আমার অভিশাপ কখনো মিথ্যা হবার নয়। তবে তুমি রাক্ষস জন্ম পেলেও পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দর্শন পাবে। গোকুলে শ্রীকৃষ্ণের শরীর যেদিন তোমার স্পর্শ হবে, সেদিনই তোমার শাপমুক্তি হবে।”

বৎসাসুর বধ
যখন কৃষ্ণ একটু বড় হলো, তখন বয়স্ক গোপেরা কৃষ্ণ-বলরাম এবং অন্যান্য গোপবালকদের ছোট ছোট বাছুরদের দেখাশুনার ভার দিলেন। তখন কৃষ্ণ ও বলরাম গোচারণে বাছুর চরাতেন এবং অন্য বালকদের সাথে খেলা করতেন। একদিন বৎসাসুর নামে এক অসুর কংসের নির্দেশে বাছুর সেজে কৃষ্ণের বাছুরদের সাথে মিশে গেল। কিন্তু যিনি সকলের অন্তর্যামী পরমাত্মা কৃষ্ণ, তিনি তা জানতেন এবং তখন কৃষ্ণ ও বলরাম বৎসাসুরের নিকটে গিয়ে তার পিছনের পা এবং লেজ ধরে ঘুরাতে ঘুরাতে একটি গাছের উপর ফেলে দিলেন। অসুরটি এতেই প্রাণত্যাগ করল।

বৎসাসুর কে ছিল
মুরু দৈত্যের পুত্র প্রমিল স্বর্গরাজ্য জয় করে ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ট মুনির আশ্রমে গমন করে। সেখানে সে নন্দিনী নামক কামধেনু গাভী দেখে বিস্মিত হয়। কেননা এই গাভীর নিকট যা চাওয়া যায়, তা-ই পাওয়া যায়। গাভীটির প্রতি তার লোভ হলে সে একটি ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে মুনির কাছে গাভীটি প্রার্থনা করে। ব্রহ্মর্ষি বশিষ্ঠ সব জানতেন। কিন্তু তিনি মৌন হয়ে রইলেন। এদিকে নন্দিনী গাভী সেই অসুরের ছলনা দেখে তাকে অভিশাপ দিলেন, “তুমি গোবৎস (বাছুর) হয়ে যাবে।” ভয়ভীত মুরু তখন ক্ষমাপ্রার্থনা করলে করুণার্দ্র গাভী তাকে আশীর্বাদ করলেন, সে দ্বাপর যুগে ভগবান শ্রীহরির কৃপায় মুক্ত হবে।

বকাসুর বধ
একদিন গোপবালকেরা তাদের গোবৎসদের জলপান করাতে যমুনার জলে নিয়ে গেলেন। হঠাৎ পাহাড়ের মতো বিশাল এক বকপাখি সেখানে এসে উপস্থিত হলো সে সকলকে ভয় দেখাতে লাগল এবং হঠাৎই কৃষ্ণকে গিলে ফেলল। তা দেখে কৃষ্ণগতপ্রাণ গোপবালকেরা সকলে জ্ঞান হারালো। এদিকে কৃষ্ণকে বকপাখিটি গিলতে পারল না, সে তার গলায় অতিশয় যন্ত্রণা ভোগ করতে লাগল। সে কৃষ্ণকে মুখ থেকে ফেলে চঞ্চু দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারতে চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু সকলের আদি উৎস ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার চঞ্চু দুটি ধরে ছিড়ে ফেললেন এবং বকপাখিটি নিহত হল। গোপবালকদের জ্ঞান ফিরে এলে তারা কৃষ্ণকে দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে তাকে আলিঙ্গন করলো। প্রত্যেকেই তাকে গভীর ভালোবাসায় বুকে জড়িয়ে রাখল। দিনাবসানে তারা গোবৎসদের একত্রিত করে ঘরে ফিরল।
বকাসুরের পূর্বজন্মের ইতিহাস
হয়গ্রীব দানবের পুত্র উৎকল ছিল ত্রিজগতে অপ্রতিহত। অহংকারবশত সে গঙ্গাসাগর সঙ্গমে গিয়ে জাজালি মুনির আশ্রমে তীক্ষè লাঠি মাছের গায়ে বিঁধিয়ে মাছ ধরে খাচ্ছিল। মুুনির দৃষ্টিগোচর হলে তিনি বুঝতে পারলেন যে মাছ ভক্ষণ অসুরের স্বাভাবিক কর্ম, কিন্তু তার আশ্রমে সেটি ঠিক হচ্ছে না। তাই তিনি উৎকলকে দূরে গিয়ে মাছ খেতে বললেন। মুনির বারংবার নিষেধ সত্ত্বেও উৎকল তা গ্রাহ্যই করল না। তখন মুনির ধৈর্যচ্যূতি ঘটল এবং তিনি অভিশাপ দিলেন, “যেহেতু তুমি বিদ্ধ করে মাছ খাচ্ছ, তাই তুমি অনুরূপ চঞ্চুবিশিষ্ট বক হয়ে যাও।” অভিশাপ পেয়ে টনক নড়লো উৎকলের। সে ক্ষমা চাইলো। তখন মুনি তাকে দ্বাপর যুগে ভগবানরে হস্তে নিহত হওয়ার সৌভাগ্য প্রদান করলেন।

অঘাসুর বধ
অঘাসুর কংসের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে বৃন্দাবনে একটি আট মাইল লম্বা বিশাল অজগরের রূপ ধরে মুখ হঁাঁ করে পড়ে রইল। সে এতই বিশাল ছিল যে, তার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল কোনো এক বিশাল পর্বতের গুহা। গোচারণরত গোপবালকেরা তাকে দেখে কৌতুহলপরায়ণ হলো এবং সেই গুহায় প্রবেশ করতে চাইল। তখন অবশ্য কারও কারও মনে হলো এটি কোনো অসুর হতে পারে। কিন্তু তৎক্ষণাৎ তাদের মনে পড়লো কৃষ্ণ আছেন তাদের সাথে। তাই তারা কৃষ্ণের প্রতি বিশ্বাস রেখে অঘাসুরের মুখে প্রবেশ করল। কিন্তু অঘাসুর কৃষ্ণের প্রতীক্ষায় ছিল। যখন কৃষ্ণ দেখলেন তার বন্ধুরা বিপদের মুখে যাচ্ছে, তিনি সেখানে এলেন এবং নিজেও অঘাসুরের মুখে প্রবেশ করলন। তখনই অঘাসুর মুখ বন্ধ করলো। কিন্তু তার পরিণতিও বকাসুরের নায় হলো। কৃষ্ণ অঘাসুরের গলদেশে নিজেকে বর্ধিত করলেন এবং এক পর্যায়ে অঘাসুর শ্বাসবন্ধ হয়ে মারা গেল। সকলে তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল। এদিকে দশদিক আলোকিত করে অঘাসুরের আত্মা কৃষ্ণের দেহে প্রবেশ করলো।
অঘাসুরের অজগরত্ব
পূর্বে অঘাসুর অতিসুন্দর এক যক্ষ ছিল। কিন্তু এজন্যই তার ছিল সৌন্দর্যের অহংকার। সেই অহংকারে মত্ত হয়ে সে একদিন মলয় পর্বতে অষ্টবক্র নামক এক মুনিকে তার কুৎসিৎ দেহের জন্য ব্যঙ্গ করলে মুনি তাকে কুৎসিৎ আকৃতির অজগর হওয়ার অভিশাপ দেন। পরবর্তীতে মুনির কাছে ক্ষমা চাইলে তিনি তাকে ভগবানের মাধ্যমে মুক্তিলাভের আশীর্বাদ দেন।

ধেনুকাসুর বধ
ব্রজম-লে তালবন নামে এক সুন্দর বন ছিল। কিন্তু ব্রজবাসীরা সেখানে প্রবেশ করতে পারত না, কেননা কংসের নির্দেশে তার ও তার আসুরিক বন্ধুদের জন্য সেখানে তালের রসের মদ তৈরি হতো। আর সেটি পাহারা দিত ধেনুক নামে গর্দভ আকৃতির এক অসুর এবং তার মতোই অসংখ্য গাধারূপী অসুর। একদিন গোচারণ করবার সময় কৃষ্ণ এবং তার বন্ধুরা সেখানে প্রবেশ করল। তারা সেখানকার সুমিষ্ট তাল আস্বাদন করতে লাগল এবং খেলতে লাগল। কিন্তু তখনই ধেনুকাসুর তার সঙ্গীদের নিয়ে সেখানে চলে এসে সবকিছ তছনছ করতে লাগল। তারা তাল দিয়ে গোপবালকদের আঘাত করতে লাগল। তখন কৃষ্ণ, যিনি কখনোই তার ভক্তদের অনিষ্ট হতে দেন না তারই বিভূতি প্রকাশ বলরামের সঙ্গে অসুরদের মোকাবিলা করতে লাগলেন। তারা একেকটি গর্দভরূপী অসুরের লেজ ধরে ছুড়ে ফেলতে লাগলেন। পরিশেষে শ্রীবলরাম ধেনুকাসুরকে লেজ ধরে ঘুরাতে ঘুরাতে বহুদূরে ছুড়ে ফেললেন। ধেনুকের ভারে অসংখ্য তালগাছ ভেঙে পড়ল এবং সেও তার বন্ধুদের মতো নিহত হলো। সেদিন থেকে তালবন ব্রজবাসীদের জন্য উন্মুক্ত হলো।
পূর্বজন্মে ধেনুকাসুর
বলী মহারাজের পুত্র সাহসিক বৈষ্ণবগৃহে জন্ম নিয়েও জড়জাগতিক সুখে আসক্ত ছিল। গর্দভেরা যেমন অন্যের সেবা করে যায় তেমনি সাহসিকও তার দশ হাজার পত্নীর মনোরঞ্জনে ব্যস্ত থেকে জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য ভুলে গিয়েছিল। একদিন গন্ধমাদন পর্বতে সে বিহার করছিল। তার আচরণে ধ্যানরত দুর্বাসা মুনির ধ্যানভঙ্গ হয়। মুনি অসন্তুষ্ট হলেও তিনি সাহসিককে কৃপা করতে চাইলেন। তিনি তাকে বললেন, তোমার আচরণ ভারবাহী গাধার মতোই। তাই তোমার গাধা হয়ে যাওয়াই উত্তম। চার লক্ষ বছর গাধা থাকার পর তুমি দ্বাপর যুগে ভগবান শ্রীবলরামের দ্বারা উদ্ধার পাবে।

কালীয় দমন
একদিন শ্রীকৃষ্ণ লক্ষ্য করলেন যমুনার কালিন্দী হ্রদে কালীয় নামক ভীষণ সর্পের প্রভাবে সবকিছু বিষময় হয়ে উঠেছে। গাছপালা, ঘাস শুকিয়ে যাচ্ছে। এমনকি কোনো পাখিও যদি সেখান দিয়ে উড়ে যেত, সে মৃত্যুবরণ করত। ব্রজবাসীরা সেই জল পান করতে পারছিলেন না। তাই কৃষ্ণ যমুনার তীরবর্তী একটি কদম্ব বৃক্ষে উঠে লাফ দিয়ে সেই হ্রদে প্রবেশ করলেন। ফলে জলে বিশাল আন্দোলন সৃষ্টি হলো, যেন কোনো বিশাল কিছু জলে পতিত হয়েছে। কৃষ্ণের মত্ত হাতির ন্যায় সাঁতারের শব্দে বিরক্ত হয়ে কালীয় নাগ বেরিয়ে এল। প্রচ- ক্রুদ্ধ হয়ে সে কৃষ্ণকে পেঁচিয়ে ধরল। কিন্তু হঠাৎ তার মনে হলো যেন বিশাল ভারী কিছু ধরে আছে। তার বন্ধন শিথিল হয়ে গেল। সে ফণা বিস্তার করে কৃষ্ণকে দংশন করতে এগিয়ে এলো কিন্তু কৃষ্ণ তাঁর মস্তকে উঠে নৃত্য করতে লাগল। অবশেষে কালীয় রক্ত বমন করতে করতে অবসন্ন হয়ে উঠলো।
কেন কালীয় ব্রজে এল
কালীয়ের পত্নীরা তখন ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতে লাগল। তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কালীয়কে ক্ষমা করলেন। পূর্বে কালীয় সমুদ্রের মধ্যবর্তী রমণক দ্বীপে থাকত। কিন্তু সেখানে গরুড়ের ভয়ে ভীত হয়ে কালীয় যমুনার কালিন্দী হ্রদে আগমন করে। কেননা সৌভরি মুনির কারণে গরুড় সেখানে আসতে পারত না। কৃষ্ণ তাঁকে বললেন, সর্পভূক গরুড় হতে তোমার আর কোনো ভয় নেই, তোমার মস্তকে আমার চরণচিহ্ন দেখে গরুড় তোমাকে বধ করবে না। তুমি নিশ্চিন্তে রমণক দ্বীপে ফিরে গিয়ে জীবহিংসা পরিত্যাগ করে বাস কর।
এভাবে আমরা দেখতে পাই, ভগবানের এই অসুরনিধন লীলা মূলত ঐসব অসুরদের মঙ্গল করবার জন্যই। তাছাড়া আমরা জানি যখন আমরা ভগবানের লীলাসমূহ আলোচনা করি তাহলে আমাদের প্রকৃত কল্যাণ সাধিত হবে। আর এসকল লীলা সম্পাদন করে ভগবান তাঁর অপ্রাকৃত মহিমা কীর্তন করবার সুযোগই আমাদের প্রদান করেছেন।
~> তথ্যসূত্র : লীলা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, গর্গসংহিতা, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ।

0 মন্তব্য