শ্রীকৃষ্ণপ্রেয়সী সত্যভামা :দামোদর মাস মাহাত্ম্য

hksamacar
নিজ ভক্তদের আনন্দবিধানের উদ্দেশ্যে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর নিত্যধাম এবং নিত্যপার্ষদদের সাথে এই ধরাধামে অবতীর্ণ হয়ে তাঁর অপ্রাকৃত লীলাবিলাস করেছিলেন। তাঁর অনন্ত ধামসমুহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দ্বারকা ধাম। যেখানে তিনি বৃন্দাবন এবং মথুরার পর লীলাবিলাস করেন। দ্বারকায় তাঁর মহিষীগণের মধ্যে অন্যতমা ছিলেন সত্যভামা দেবী। তিনি ছিলেন রাজা সত্রাজিতের কন্যা। সত্রাজিত সূর্যদেবের আরাধনা করে স্যমন্তক নামক একটি মণি প্রাপ্ত হন, যা থেকে প্রত্যহ নির্দিষ্ট পরিমাণে স্বর্ণ উৎপন্ন হতো। একদিন ঘটনাক্রমে তাঁর সেই মণিটি হারিয়ে গেলে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তা উদ্ধার করেন। তখন সত্রাজিত নিজ কন্যা সত্যভামা সহিত ঐ মণিটি পরমেশ্বর ভগবানের হস্তে অর্পণ করেন। একবার নারদ মুনি শ্রীকৃষ্ণের প্রধান ভার্যা রুক্মিণী দেবীকে একটি পারিজাত পুষ্প নিবেদন করলে সত্যভামা দেবীরও তা প্রাপ্তির ইচ্ছা হয়। সেই কথা তিনি শ্রীকৃষ্ণকে জানালে সমস্ত জগতের অধিপতি শ্রীকৃষ্ণ স্বর্গ থেকে কেবল পারিজাত পুষ্পই নয় বরং গোটা পারিজাত বৃক্ষটিই সত্যভামা দেবীর জন্য নিয়ে আসেন। এভাবে সত্যভামা দেবী নানাভাবে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কৃপা প্রাপ্ত হন।
স্কন্দপুরাণ বিষ্ণুখণ্ডের কার্তিকমাহাত্ম্যের ত্রয়োদশ অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও সত্যভামাদেবীর একটি বিশেষ কথোপকথন বর্ণিত আছে। কার্তিক মাস তথা দামোদর মাস মাহাত্ম্য প্রসঙ্গে শ্রীল সূত গোস্বামী এ আখ্যানটি সমবেত ঋষিদের সম্মুখে বর্ণনা করেন।
একদিন দ্বারকায় পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্যতম সৌভাগ্যবতী মহিষী সত্যভামা দেবী তাঁর প্রতি শ্রীকৃষ্ণের কৃপার ফলে অতিশয় আনন্দিত হয়ে তাঁর এইসকল সৌভাগ্যের বিষয়ে ভাবতে লাগলেন। কৃতজ্ঞতাপূর্ণ চিত্তে তিনি পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞেস করলেন, “হে প্রভু! আপনি মহান দেবতা থেকে তুচ্ছ কীট পর্যন্ত এই সৃষ্টির সকল জীবের, সকল বস্তুর একমাত্র প্রভু। আপনার জয় হোক! আমার প্রতি আপনার অপ্রাকৃত কৃপাবশত আমি ধন্য, আমি কৃতকৃত্য। আজ আমার জীবন সফল হলো। হে ভগবান! আমি আপনার প্রীতির উদ্দেশ্যে এমন কি দান, ব্রত বা তপস্যা করেছিলাম যে সামান্য নারী হয়ে কীভাবে আপনাকে পতিরূপে লাভ করতে পারলাম? পূর্বজন্মে আমি কার কন্যা ছিলাম? আমার ক্রিয়াকর্মই বা কেমন ছিল যে আমি আপনার বল্লভা হতে পেরেছি? কৃপাপূর্বক আমাকে তা জানান।” পরমেশ্বর ভগবান তখন তাঁকে বলতে লাগলেন- “হে দয়িতে! তুমি পূর্বজন্মে জগতের হিতকর যে অভাবনীয় সুকৃতি করেছিলে তা তোমাকে বলছি। একাগ্র হয়ে তা শ্রবণ কর।
সত্যযুগের শেষদিকে মায়াপুরীতে (হরিদ্বারে) সবরকম বৈষ্ণবীয় গুণে ভূষিত একজন উত্তম ব্রাহ্মণ বাস করতেন। পরম বিষ্ণুভক্ত সেই ব্রাহ্মণের নাম ছিল দেবশর্মা। গুণবতী নামে তাঁর একটিমাত্র কন্যা ছিল। সেও ছিল সবরকম স˜গুণে ভূষিতা। বাল্যকাল অবধি সে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভক্তিতে দৃঢ়নিষ্ঠ ছিল। দেবশর্মার এক বৈষ্ণবতাগুণসম্পন্ন পরমভক্ত শিষ্য ছিল। তাঁর নাম ছিল চন্দ্র। তিনি চন্দ্রকে পুত্রের ন্যায় স্নেহ করতেন। চন্দ্রও তাঁকে পিতার ন্যায় সম্মান করতেন। একসময় দেবশর্মা চন্দ্র্রের সাথে গুণবতীর বিবাহ দেন।
একদিন যজ্ঞের জন্য পবিত্র কুশঘাস এবং কাঠ আনবার জন্য দেবশর্মা এবং চন্দ্র উভয়ে বনে গমন করেন। হঠাৎ ভগবানেরই ইচ্ছাবলে এক ভয়ংকর রাক্ষসী তাদের সামনে উপস্থিত হয়ে তাঁদের হত্যা করে। যেহেতু তাঁরা উভয়েই বিষ্ণুর প্রিয়পাত্র পরম বৈষ্ণব ছিলেন, তাই তাঁদের সুকৃতির প্রভাবে তাঁরা উভয়েই জড়জগতের উর্ধেŸ বিষ্ণুলোকে গমন করেন। পিতা ও পতির মৃত্যুশোকে গুণবতী অত্যন্ত কাতর হয়ে বিলাপ করতে থাকে। পরে সে গৃহের সকল আসবাবপত্র বিক্রি করে দিয়ে পিতা এবং পতির মঙ্গলের জন্য পরমেশ্বর ভগবানের প্রীতির উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে। শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন হলে তিনি ভগবানের সেবাপরায়ণা হয়ে সেই গৃহেই বাস করতে লাগলেন।
গুণবতী বাল্যকাল থেকেই নানাবিধ সদ্গুণে ভূষিতা ছিল। সে ছিল হরিভক্তিপরায়ণা। সে হরিপ্রিয় একাদশী ব্রত এবং দামোদর মাস ব্রত অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করত। সারাজীবনই ভক্তিসহকারে সে একাদশী এবং দামোদর মাস পালন করেছিল। একবার দামোদর ব্রতকালে সে প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হন। কিন্তু তা সত্ত্বেও নিষ্ঠা সহকারে তাঁর ব্রত সে চালিয়ে যায়। সেই অবস্থাতেই সে নিত্যকার গঙ্গাস্নান করবার উদ্দেশ্যে গঙ্গাতীরে গমন করে। যখন গঙ্গাস্নান করার সময়ে প্রবল শীতে পীড়িত হয়ে গুণবতী কাঁপতে কাঁপতে দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে পড়ে, তখনই হঠাৎ একটি দিব্য বিমান তাঁর সামনে আকাশ থেকে অবতরণ করে। কার্তিক ব্রতের পূণ্যপ্রভাবে সেই বৈকুণ্ঠ বিমানে আহরণ করে গুণবতী বিষ্ণুর নিবাস বৈকুণ্ঠভবনে গমন করে।
দ্বাপরের শেষে আসুরিক রাজাদের দ্বারা পীড়িত হয়ে পৃথিবীদেবীর সঙ্গে ব্রহ্মাদি দেবতাগণ তঁ*াদের সুরক্ষার জন্য আমার নিকটে প্রার্থনা নিবেদন করেন। তাঁদের প্রার্থনায় এবং আমার অন্তরঙ্গ ভক্তদের আনন্দবিধানের উদ্দেশ্যে আমি এজগতে স্বয়ংরূপে অবতীর্ণ হলাম। তখন আমি আমার নিত্যধাম, নিত্যপার্ষদ সকলকে সঙ্গে নিয়েং অবতীর্ণ হলাম। এই যেসকল যাদবদের দেখছ, চিন্ময় জগতে এঁরা সকলেই আমার নিত্যপার্ষদ। এখন তাঁরা আমার লীলার পুষ্টির জন্য আমার সাথে আবির্ভূত হয়েছে।
হে ভামিনী! পূর্বের সেই গুণবতীই হলে তুমি। মৃত্যু অবধি অবিচলা ভক্তিসহকারে দামোদর মাস ব্রত পালনের পরমসুকৃতির প্রভাবে তুমি আমার পত্নী হয়েছ। যেহেতু তুমি জীবনে কখনও কার্তিক মাস ব্রত হতে বিচ্যূত হওনি, তাই তুমি কখনই আমার থেকে বিচ্যূত হবেনা। যেহেতু তুমি আমার মন্দিরের সম্মুখে তুলসীকানন রচনা করেছিলে, তাই আজ তোমার সুশোভন প্রাসাদাঙ্গণে এই কল্পবৃক্ষটি দেখতে পাচ্ছ। আর তোমার সেই জন্মের পিতা দেবশর্মা আমার লীলার পুষ্টির জন্য সত্রাজিৎ রূপে আবির্ভূত হয়েছে। আর বিষ্ণুভক্ত চন্দ্র অক্রুর রূপে আবির্ভূত হয়েছে।”
এভাবে দামোদর মাস ব্রতের অপ্রাকৃত মহিমা পরমেশ্বর ভগবান বর্ণনা করেন। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এতই কৃপাময় যে তিনি হরিনাম সংকীর্তনের পাশাপাশি আমাদের কৃষ্ণভাবনাময় হওয়ার আরও সুযোগ দিচ্ছেন একাদশী, জন্মাষ্টমী প্রভৃতি উৎসবাদি প্রদানের মাধ্যমে। এর মধ্যে একটি সুদুর্লভ উৎসব হচ্ছে দীপালোকময় দামোদর মাস। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এমাসে তাঁর বাৎসল্যরসের সর্বোত্তম লীলা, দামবন্ধন লীলা অনুষ্ঠান করে নিজে যেমন দামোদর নাম ধারণ করেছেন, তেমনি এই মাসটিকেও একই নাম প্রদানপূর্বক করেছেন মহিমান্বিত।
কার্তিক মাসে ভগবানের উদ্দেশ্যে দীপদানের মাহাত্ম্য অপরিসীম। পদ্মপুরাণের উত্তরখণ্ডে পরমভাগবত শিবজী দামোদর মাসের মহিমা বর্ণনা করে বলেন,

দীপদানঞ্চ মহাসেন কুলানা তারয়েৎ শতম্ ॥  
অর্থাৎ, “হে মহাসেন! কার্তিক মাসে যে শ্রীহরিকে একটি দীপ অর্পণ করেন, তার শতকুল উদ্ধার পায়।” (১২১/১৪)
তেনেষ্টং ক্রতুভিঃ সর্বৈঃ কৃতং তীর্থবগাহনম্।
দীপদানং কৃতং যেন কার্তিকে কেশবাগ্রতঃ ॥
অর্থাৎ, যিনি কার্তিকে কেশবকে দীপ দান করেন, তার সর্বতীর্থে অবগাহন করা হয়। (১২১/৩০)
বোধনাৎ পরদীপস্য বৈষ্ণবানাঞ্চ সেবনাৎ।
কার্তিকে ফলমাপ্নোতি রাজসূয়াশ্বমেধয়োঃ ॥
কার্তিকে ভগবান শ্রীহরির উদ্দেশ্যে অন্য ভক্তের দ্বারা অর্পিত প্রদীপকে নিভু-নিভু অবস্থা থেকে জাগিয়ে দিলে ব্যক্তি রাজসূয় এবং অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ করে। (১২১/৪৪)
তুলসীপত্রলক্ষেণ কার্তিকে যোহর্চয়েৎ হরিম্।
পত্রে পত্রে মুনিশ্রেষ্ঠ মৌক্তিক লভতে ফলম্ ॥
কার্তিক মাসে যারা শ্রীহরিকে তুলসীপত্র অর্পণ করেন, তারা প্রতিটি পত্র অর্পণে মুক্তি লাভ করার ফল লাভ করেন। (১১৮/৫৫)
পরম মঙ্গলময় দামোদর মাসকে অবহেলা করা উচিত নয়। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সর্বাবস্থাতেই আমাদের প্রতি করুণাময়, আর তাই তিনি আমাদের কৃষ্ণভাবনাময় হওয়ার জন্যই এই দামোদর-মাস প্রদান করেছেন। ভগবানের প্রতি ভক্তিভাব বৃদ্ধির জন্য আমাদের ভক্তির সহকারেই দামোদর মাস পালন করা উচিত।

0 Comments