আমার বিশ্বাস কতটা দৃঢ়!

hksamacar
শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু একদিন পবিত্র হরিনাম জপ করার যোগ্যতা প্রসঙ্গে শ্রীল হরিদাস ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করেন। পরমভক্ত শ্রীল হরিদাস ঠাকুর বললেন, “হরিনাম জপকে যুগধর্ম হিসেবে জেনে, অকিঞ্চন ভক্তিসহকারে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র নামের আশ্রয় গ্রহণ করে যে ব্যক্তি, তিনিই হরিনাম জপের যোগ্য। আর এই জপের মাধ্যমে তিনি সবকিছুই অর্জন করেন।”
শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর বিশ্বাসের গুরুত্ব সম্পর্কে এরূপ বলেছেন: দান, যজ্ঞ, গঙ্গাস্নান বা বৈদিক মন্ত্র জপ করার সময় একজনকে অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হয় যে, স্থান, কাল ও বস্তুসমূহ শুদ্ধ বা উপযুক্ত কিনা। ফলে এসব বিবেচনা করতেই অধিক সময় ব্যয় হয়। কিন্তু কারো যদি কেবল বিশ্বাস বা নিষ্ঠা থাকে, তাহলেই সে হরিনাম জপ করার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। বিশ্বাস থাকলে অন্য কোনো কিছুই যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করার প্রয়োজন নেই। অন্যভাবে বলা যায়, জপমালা বা দীক্ষা বা দীক্ষাকালীন প্রদত্ত নাম কাউকে হরিনাম জপ করার যোগ্য করে তোলে না। শুধু অবিচল নিষ্ঠা আর বিশ্বাস-ই হরিনাম জপের যোগ্যতার মাপকাঠি।
আপনি যখন জপ করা শুরু করেছেন, তার অর্থ দাঁড়ায় অবশ্যই আপনার একটা পর্যায় পর্যন্ত বিশ্বাস আছে, তা না হলে আপনি জপ করা শুরু করতেন না। যখন আপনি এই বিশ্বাসকে দৃঢ় করবেন, তখন দেখবেন যে জপ করার সাথে সাথেই পবিত্র হরিনাম সাড়া দেওয়া শুরু করেছে। অন্যভাবে বলা যায় যে, বিশ্বাস নিয়ে জপ করা ব্যক্তির সাথে বিশ্বাসহীন জপকারী ব্যক্তির পার্থক্য রয়েছে।
এর অর্থ, আপনার যদি ভক্তিজীবন অনুশীলনে সুদৃঢ় বিশ্বাস না থাকে, তবে আপনি খুব বেশি এগিয়ে যেতে পারবেন না। যদি আপনি প্রতিদিন জপ করবার শুধু অভ্যাস গড়ে তোলেন, তাহলে অচিরেই আপনি পারমার্থিক হরেকৃষ্ণ আন্দোলনের নব্যদীক্ষিতদের দলে শামিল হবেন। কিন্তু আপনি প্রতিনিয়ত আপনার মনের সাথে যুদ্ধ করবেন এবং একজন উদ্ধত পশ্চিমা হিসেবেই থেকে যাবেন, যিনি কিনা হৃদয়ের শুদ্ধতার চেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর ওপর আলোচনা করাকেই বেশি সমাদর করে থাকে। ফলশ্রুতিতে আপনি আপনার হৃদয়ের সত্যিকারের পারমার্থিক অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত থেকে যাবেন।
শ্রীল জীব গোস্বামীর মতে দু’ধরনের বিশ্বাস আছে। প্রথমটি হচ্ছে, ‘লৌকিক শ্রদ্ধা’, যা হলো এই পার্থিব জগতের বিষয়াদির প্রতি বিশ্বাস। যেমন কেই বিশ্বাস করতে পারে যে, যদি কেউ ভালো পোশাক পড়ে তবে সে অপরের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অথবা কেউ যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, তাহলে তার ভালো চাকুরি পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। এ ধরনের বিশ্বাস আসাটা অস্বাভাবিক নয়। কারণ এসকল বিষয় আমরা প্রতিনিয়ত দেখে থাকি।
দ্বিতীয় প্রকারের বিশ্বাস হলো, ‘অলৌকিক শ্রদ্ধা’ বা পারমার্থিক বিশ্বাস। এসকল বিষয়ের অভিজ্ঞতা যেমন সহজে হয় না, তেমনি সহজ যুক্তির দ্বারা তাকে বোঝাও যায় না। এটি হলো মনের সেই অবস্থা, যখন সকল সন্দেহ দূরীভূত হযে যায় এবং ভক্তিযুক্ত সেবার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব উৎপন্ন হয়। এটি হচ্ছে মনের সেই অনুভূতি যখন আপনা থেকেই মন বলবে, “হ্যাঁ, আত্মোপলব্ধির এটিই পথ এবং এখন থেকেই আমি এটা করব।” এবং আপনি সেই কাজ করতে থাকবেন। শুধু প্রতিজ্ঞাবদ্ধ কর্তব্যজ্ঞানে নয় বরং কৃষ্ণের প্রতি ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা বা এরূপ কোনো অনুকূল অনুভূতির প্রভাবে।
বিশ্বাস ও সমর্পন পরস্পর পরিপূরক। যার গভীর বিশ্বাস রয়েছে সে কৃষ্ণের প্রতি পূর্ণ সমর্পিত। অন্যদিকে দুর্বল বিশ্বাসী মানুষ কৃষ্ণের প্রতি সমর্পিত হতে পারে না। বিশ্বাসে ভর করে আপনি জপে অধিক সমর্পিত হতে পারেন। অর্থাৎ আপনাকে আপনার অহংকারকে ত্যাগ করতে এবং নিজেকে পূর্ণরূপে ধ্যানে নিমজ্জিত করতে সক্ষম হবেন। তখন পবিত্র হরিনাম তাঁর চিৎশক্তি নিয়ে আপনার মধ্যে বিকশিত হবে। আর প্রচ- উদ্যম অনুভব করতে থাকবেন।
পারমার্থিক বিশ্বাস শক্তির জন্ম দেয়, যাকে বলে ‘বীর্য’। এটি হচ্ছে প্রাণশক্তি, ভক্তিজীবনের পথে এক তেজোময় প্রেরণা। এরূপ অর্থও হয় যে যদি আপনার বিশ্বাস দুর্বল হয়, তাহলে আপনি ভক্তিজীবন অনুশীলনের জন্য সহজাত শক্তি থেকে বঞ্চিত থাকবেন।
প্রত্যুষে ঘুম থেকে উঠে মঙ্গলারতি করা, অনেকক্ষণ ধরে জপ-কীর্তন করা, গ্রন্থবিতরণ করা বা যে কোনো প্রকার ভক্তিপূর্ণ কর্ম করা তখনই সম্ভব হবে, যখন আপনার বিশ্বাস থাকবে। অন্যথায় আপনি এসকল কার‌্যাবলীতে পিছিয়ে থাকবেন। অধিকন্তু যখন আপনার অন্তঃস্থ শক্তি থাকবে, তখন আপনি ‘স্মৃতি’ বা অবিচল মন লাভ করবেন। তার অর্থ আপনি সর্বদা, সকল অবস্থায় ভক্তিজীবনের নীতিসমূহ স্মরণে রাখবেন।
যা-ই ঘটুক না কেন, আপনি তখন আপনার হৃদয়ে সর্বদা আপনার লক্ষ্য এবং শাস্ত্রের নির্দেশনাসমূহকে স্মরণ এবং ধারণ করতে সক্ষম হবেন। এই বীর্য এবং স্মৃতি থেকে আরও অনেক সম্পদ গড়ে ওঠে। যেমন অখ- মনোযোগ আর আত্ম-উপলব্ধি। সেই উপলব্ধি যা প্রকাশ করে আমি দেহ বা মন নই, আমি চিরন্তন আত্মা। তাই আমি মনে করি যে এই প্রশ্নটি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, “আমার কিশ্বাস কতটা দৃঢ়?”
পবিত্র হরিনাম জপ করার সাথে এ আলোচনার প্রাসঙ্গিকতা এই যে, আপনি যখন জপ করা শুরু করেছেন, তার অর্থ দাঁড়ায় অবশ্যই আপনার একটা পর্যায় পর্যন্ত বিশ্বাস আছে, তা না হলে আপনি জপ করা শুরু করতেন না। যখন আপনি এই বিশ্বাসকে দৃঢ় করবেন, তখন দেখবেন যে জপ করার সাথে সাথেই পবিত্র হরিনাম সাড়া দেওয়া শুরু করেছে। অন্যভাবে বলা যায় যে, বিশ্বাস নিয়ে জপ করা ব্যক্তির সাথে বিশ্বাসহীন জপকারী ব্যক্তির পার্থক্য রয়েছে। প্রথমোক্ত ব্যক্তি যা লাভ করে, পরের ব্যক্তি সেটি থেকে তখনো পর্যন্ত বঞ্চিত থাকে। যখন কেউ দৃঢ়তার সাথে জপ করে তখন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার খুব নিকটে চলে আসেন এবং সর্বতোভাবে তার জীবন পূর্ণ করে তোলেন।

0 Comments