রাজশাহীর বৈষ্ণব তীর্থ খেতুরী

রাজশাহীর শ্রীপাট খেতুরীতে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় খেতুরী উৎসব, যা বাংলাদেশের এক অন্যতম উৎসব হিসেবে পরিচিত যেখানে বিপুল সংখ্যক ভক্তের সমাগম ঘটে। এই সুপ্রাচীন খেতুরী উৎসবের ঐতিহ্য প্রায় সাড়ে চারশো বছরের পুরনো। যার উদ্যোগে খেতুরীতে প্রথম অনুষ্ঠিত হয় এই মহাবৈষ্ণব সম্মেলন, যিনি শ্রী খেতুরী পাটকে এতো মহিমান্বিত করেছেন, তিনি হচ্ছেন প্রেমভক্তির মহাজন শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুর। এই খেতুরী উৎসবটি ঠাকুর মহাশয় কর্তৃক গৌরপূর্ণিমা তিথিতে পালিত হলেও এখন ঠাকুর মহাশয়ের তিরোভাব তিথিতেই এ উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয়।
hksamacar

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অন্তর্ধানের পর যে তিনজন আচার্য হরিনাম প্রচারে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম মহান বৈষ্ণব আচার্য, অসংখ্য ভক্তিগীতির প্রণেতা এবং মহাপ্রভুর বিশেষ কৃপাধন্য। এই মহান আচার্যকে ‘ঠাকুর মহাশয়’ উপাধিটি প্রদান করেন শ্রীল জীব গোস্বামী। শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুর বাংলাদেশ, আসাম, মেঘালয়, মণিপুর ও ত্রিপুরায় মহাপ্রভুর নাম ও প্রেমধর্মের প্রচার করেন। তিনি পঞ্চদশ শকাব্দের মধ্যভাগে মাঘী পূর্ণিমার পূন্যতিথিতে আবির্ভূত হন। তার পিতা ছিলেন গোপালপুর পরগণার অধিপতি রাজা কৃষ্ণানন্দ দত্ত ও জননী নারায়ণী দেবী। অন্নপ্রাশনের সময় এক রোমাঞ্চকর ঘটনা ঘটে, সবাই যখন ঠাকুর মহাশয়ের মুখে অন্ন তুলে দিচ্ছিল তখন তিনি বারবার মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন এবং কোনোভাবেই অন্ন মুখে নিচ্ছিলেন না। উপস্থিত এক জ্যোতিষ বিষয়টি দেখেই বুঝতে পেরে বলেছিলেন, “এ শিশু ভবিষ্যতে মহাপুরুষ হবে এবং শ্রীবিষ্ণুর প্রসাদ ব্যতীত অন্য কিছু ভোজন করবে না।” তখন রাজগৃহে সেবিত শ্রীকৃষ্ণ বিগ্রহের প্রসাদ দেওয়া হলে নরোত্তম পরমানন্দে গ্রহণ করেন। শৈশবেই নরোত্তম ব্যাকরণ সহ যাবতীয় সংস্কৃতশাস্ত্রে অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেন। বাল্যকাল থেকেই তার মধ্যে শ্রীমদ্ভাবত, হরিনাম জপ-কীর্তন ও শ্রীবিগ্রহসেবায় আসাধারণ নিষ্ঠা পরিলক্ষিত হয়। নরোত্তম দাস ঠাকুর যে, মহাপ্রভুর অত্যন্ত প্রিয়জন ছিলেন তা বোঝা যায়, নরোত্তমের জন্য মহাপ্রভুর পদ্মায় প্রেম গচ্ছিত রাখার লীলা থেকে। নিত্যানন্দ প্রভুর স্বপ্নাদেশে নরোত্তম দাস ঠাকুর জানতে পারেন এবং পদ্মায় স্নান করে মহাপ্রভুর গচ্ছিত সেই প্রেম তিনি লাভ করেন। পরবর্তীতে মহাপ্রভু কর্তৃক স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে নরোত্তম দাস ঠাকুর বৃন্দাবনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে এবং লোকনাথ গোস্বামী চরণাশ্রয় গ্রহণ করেন। লোকনাথ গোস্বামীর নিকট নরোত্তমের দীক্ষা লাভের লীলাও অত্যন্ত শিক্ষণীয়। লোকনাথ গোস্বামী শিষ্য গ্রহণ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলে, নরোত্তম দীর্ঘদিন লোকনাথ গোস্বামীর সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। সকলের অলক্ষ্যে তিনি লোকনাথ গোস্বামীর বাহ্যক্রিয়াদির স্থান মার্জন করতেন। বিষয়টি লোকনাথ গোস্বামী জানতে পেরে হৃদয় বিগলিত হয় এবং নরোত্তমকে দীক্ষা দান করেন। নরোত্তম দাস ঠাকুর দীক্ষা গ্রহণের পর ব্রজমণ্ডলে ভজন করতে থাকেন এবং পরবর্তীতে জীব গোস্বামীর আদেশে বঙ্গদেশে প্রচারে নিযুক্ত হন। খেতুরীতে এসে ঠাকুর মহাশয় শ্রীবিষ্ণুপ্রিয়া গৌরাঙ্গ, বল্লভীকান্ত, শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীব্রজমোহন, শ্রীরাধা-রমণ ও শ্রীরাধাকান্ত এ ছয় বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। গৌরপূর্ণিমা তিথিতে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা উপলক্ষ্যে নরোত্তম দাস ঠাকুর খেতুরীতে মহা মহোৎসবের আয়োজন করেন। উৎসবে শ্রীজাহ্নবা মাতা, শ্রীনিবাস আচার্য, শ্রীশ্যামানন্দ প্রভু সহ অনেক মহান বৈষ্ণবের শুভাগমন ঘটে। যখন নরোত্তম দাস ঠাকুর কীর্তন করছিলেন তখন স্বয়ং গৌরসুন্দর সপার্ষদ সেখানে উপস্থিত হয়ে দর্শন দান করেন।
এরপর শ্রীনরোত্তম ঠাকুর মহাশয় খেতুরীতে অবস্থান করে প্রচার করতে থাকেন এবং ফলে রাজা, জমিদার সহ বহু লোকজন দলে দলে বৈষ্ণব হতে থাকেন। তার প্রচার শুধু বঙ্গ দেশেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে ত্রিপুরা, মণিপুর ও অন্যান্য রাজ্যে। ঠাকুর মহাশয়ের অন্তর্ধান লীলাও অতন্ত্য তাৎপর্যপূর্ণ, তিনি একবার স্নান করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তার প্রধান দুই শিষ্য রামকৃষ্ণ আচার্য ও গঙ্গানারায়ণ চক্রবর্তী গঙ্গায় নিয়ে যান। নরোত্তম ঠাকুর শিষ্যদের আদেশ দেন, 
‘আজ্ঞাকৈলা রামকৃষ্ণ গঙ্গানারায়ণে।
মোর অঙ্গ মার্জ্জন করহ দুজনে ॥
দোহে কিবা মার্জ্জন করিবা পরশিতে।
দুগ্ধপ্রায় মিশাইলা গঙ্গার জলেতে ॥
দেখিতে দেখিতে শীঘ্র হৈলা অন্তর্ধান।
অত্যন্ত দুর্জ্ঞেয় ইহা বুঝিব কি আন ॥ ’
ভক্তগণ তখন গঙ্গা থেকে সেই দুগ্ধজল নিয়ে গঙ্গানারায়ণ চক্রবর্তীর বাড়ির পাশে (মুর্শিদাবাদ জেলার জিয়াগঞ্জ) সমাধি দেন, যাকে বলা হয় ‘দুগ্ধ সমাধি’ এবং ঐ ঘাটকে বলা হয় ‘দুধ ঘাট’। নরোত্তম দাস ঠাকুরের অন্তর্ধান তিথি স্মরণ করে খেতুরীতে এখনও মহাসাড়ম্বরে উৎসব হয়ে থাকে।

0 Comments