বিনম্র শরণাগতি - পুরুষোত্তম নিতাই দাস

অর্জুন কখনো কোনো যুদ্ধে পরাজিত হননি, কিন্তু আজ কৌরব এবং পা-ব সৈন্য দলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি তার সেই বহু শক্তিশালী বিজয়ী গাণ্ডীব ধনুকটি ধারণ করতেও সমর্থ হলেন না। তিনি অত্যন্ত বিষাদগ্রস্ত। তার সমস্ত দেহ কম্পিত হচ্ছিল। তিনি কৃষ্ণকে বললেন, আমার পক্ষে এই যুদ্ধ করার চেয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন ধারণ করা শ্রেয়। প্রকৃতপক্ষে তিনি নৈতিক এবং অনৈতিক আচরণের পার্থক্য নির্ণয় করতে অক্ষম ছিলেন। সুতরাং তিনি তার জাগতিক নাম, খ্যাতি এবং যশকে এক পাশে সরিয়ে রেখে এই বিসদৃশ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তার সমস্ত দ্বিধা কৃষ্ণের সম্মুখে উপস্থিত করে তাঁকে কৃপা করে পথ নির্দেশ করার অনুরোধ করলেন। অর্জুনের আগ্রহ এবং সর্বোপরি তার বিনম্রতা শ্রীকৃষ্ণকে সন্তুষ্ট করেছিলেন এবং তিনি অবিলম্বেই অর্জুনকে তাঁর শিষ্যরূপে স্বীকার করলেন। আমরা সকলেই জানি কীভাবে শ্রীকৃষ্ণের মহিমান্বিত শব্দসমূহ অর্জুনের জীবনকে পরিবর্তিত করেছিল এবং আজও সেই জ্ঞানধারা আমাদের মতো লক্ষ লক্ষ জীবনযুদ্ধের যোদ্ধাদের পথ নির্দেশ করে চলেছে। এটা লক্ষণীয় যে, যতক্ষণ অর্জুন তার দর্শনে অটল ছিলেন এবং কৃষ্ণের নির্দেশাবলি গ্রহণে অনিচ্ছুক ছিলেন ততক্ষণ কৃষ্ণ তার সম্মুখে এই দিব্য জ্ঞান প্রকাশ করেননি। আমরাও যদি আমাদের জীবনের মূল সমস্যাগুলো সমাধান চাই এবং কৃষ্ণের বাণী অনুধাবন করতে চাই তাহলে আমাদের নিজস্ব জড়জাগতিক জ্ঞানসমূহ সরিয়ে রেখে এই আধ্যাত্মিক জ্ঞান প্রার্থনা করতে হবে।
surrender-to-krishna
Surrender-to-Krishna
অর্জুন তার উদাহরণের মধ্য দিয়ে আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন গুরুর কাছে আধ্যাত্মিক পথ নির্দেশ প্রার্থনা করতে হলে আমাদের চেতনা কেমন হওয়া উচিত। যদি আমরা ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখতে পাবো, সকল আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বই তাদের গুরু গ্রহণের সময় কত বিনম্র ছিলেন। তাদের এই বিনম্রতা কৃত্রিম ছিল না, বরং তারা প্রকৃতই অনুভব করতেন যে, তারা অজ্ঞ এবং শুধু তাদের আধ্যাত্মিক গুরুর কৃপাতে তাদের উদ্ধার সম্ভব হতে পারে।
সনাতন গোস্বামী পঞ্চদশ শতকে বাংলার নবাব হুসেন শাহ্ এর এক উচ্চপদস্থ মন্ত্রী ছিলেন। জীবনের সকল ভোগবিলাস তাঁর ছিল- বিশাল প্রাসাদ, উপভোগ করার জন্য অপরিমিত সম্পদ এবং সেবা করার জন্য অসংখ্য দাস-দাসী। তিনি একজন বিদগ্ধ পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন এবং সংস্কৃতি, আরবি ও ফারসি ভাষার পণ্ডিত ছিলেন। কিন্তু যখন আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করার জন্য শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কাছে গেলেন তখন দন্তে তৃণ ধরে তিনি ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে পতিত হয়েছিলেন। অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে তিনি বলেছিলেন, ‘অত্যন্ত নীচ কুলে আমার জন্ম হয়েছে এবং আমার সঙ্গীরাও নীচকুলোদ্ভূত আমি পতিত এবং নিকৃষ্টতম মানুষ। অবশ্য আমি আমার সমস্ত জীবন পাপময় জড়সুখে অতিবাহিত করেছি প্রকৃতপক্ষে আমি জানি না কীভাবে জীবনের উদ্দেশ্য অনুসন্ধান করে সেই লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়। আমাকে কৃপা করে সেই সত্য বিবৃত করুন। (চৈ.চ মধ্য ২০.৯৯, ২০.১০৩)
শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর একজন বিদগ্ধ পণ্ডিত ছিলেন কিন্তু যখন তিনি তাঁর গুরু শ্রীল গৌরকিশোর দাস বাবাজি মহারাজের কাছে গিয়েছিলেন, তখন তিনিও তার জড়জাগতিক পা-িত্যকে একপাশে সরিয়ে রেখেই তাঁর কাছে শরণাগত হয়েছিলেন। শ্রীল প্রভুপাদ অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে স্বীকার করতেন যে, তার সমস্ত যুক্তিতর্কই অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তার গুরু শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর নস্যাৎ করেছিলেন এবং অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মের পথ নির্দেশ তাকে দিয়েছেন।  এই মহান আত্মাগণ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন যে, গুরুর সম্মুখে আমাদের নিজেদেরকে তুচ্ছ মনে করা উচিত, আমাদের বোধ ও শিক্ষা আমাদের কখনোই এই জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে উদ্ধার করতে সমর্থ হবে না। আমাদের থেকে স্বল্প শিক্ষাসম্পন্ন হতে পারেন; কিন্তু আধ্যাত্মিক দিক থেকে তাঁরা অত্যন্ত অভিজ্ঞ। কারণ, তাঁরা স্বীকৃত গুরু পরম্পরার প্রতিনিধিত্ব করছেন।
এই মানসিকতা নিয়েই আমাদের গুরুর কাছে যাওয়া উচিত। আমাদের জড়জাগতিক শিক্ষাকে একপাশে সরিয়ে রেখে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে গুরুর শরণাগত হওয়া উচিত। যেহেতু গুরুপরম্পরা ধারার মাধ্যমে জ্ঞান দান করেন তাই সেই জ্ঞান অকলুষিত ভাবে প্রকৃতপক্ষে শ্রীকৃষ্ণের নিকট হতে প্রবাহিত হচ্ছে। গুরুর সম্মুখে আমাদের নিজেদের কখনোই বিদগ্ধ পণ্ডিতরূপে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা উচিত নয়।
একদা দুজন ছাত্র গিটার শিখতে সঙ্গীত শিক্ষকের কাছে গিয়েছিল। একজন ছাত্র বলল, ‘মহাশয়’ আমি সঙ্গীত সম্বন্ধে কিছুই জানি না। সেজন্য আমি আপনার কাছে এসেছি।’ শিক্ষক আনন্দের সঙ্গে তাকে গ্রহণ করে বললেন, তাকে প্রতি মাসে পাঁচশ টাকা পারিশ্রমিক দিতে হবে। দ্বিতীয় ছাত্রটি বলল, ‘মহাশয়’ সঙ্গীত সম্বন্ধে আমার জ্ঞান আছে এবং আমি গিটার বাজাতেও পারি। আমি শুধু আমার দক্ষতাকে আরও উন্নত করার জন্য এসেছি। গুরু বললেন যে, ‘আমি তোমাকেও শেখাব কিন্তু তোমাকে মাসে এক হাজার টাকা পারিশ্রমিক দিতে হবে। গুরু বিনীতভাবে বললেন। কারণ প্রথমে তোমার ভুল দক্ষতাগুলোকে সংশোধন করে তার পরে তোমাকে শিক্ষাদান করতে হবে কীভাবে গিটার বাজাতে হয়। গুরুর কাছে আমাদের খোলা মন নিয়ে যাওয়া উচিত যাতে তার সমস্ত নির্দেশ আমরা যথাযথভাবে গ্রহণ করতে পারি।
একজন গুরু জানেন কীভাবে সর্বোত্তম উপায়ে তার সকল শিষ্যকে সেবার নিযুক্ত করা যায় যাতে তাদের চেতনাশুদ্ধি হয়ে তারা ধীরে ধীরে কৃষ্ণপ্রেম লাভ করতে পারে। যখন জগন্নাথ দাস বাবাজি মহারাজের শিষ্যকে তাঁর কাছে এসে তাঁর মতো নির্জন-ভজন এবং অষ্টকালীয় লীলা-স্মরণ(কৃষ্ণের অষ্টাঙ্গিক প্রাত্যহিক লীলার উপর ধ্যান) অভ্যাস করতে চাইতেন তখন বাবাজি মহারাজ তাদের এই লীলা বিলাসের উপদেশ দিতে অস্বীকার করতেন এবং পরিবর্তে তাদের ভগবানের কাছে নিবেদন করার জন্য তুলসী বৃক্ষ, বিভিন্ন ফুল এবং শাকসবজির গাছ রোপণ করতে উৎসাহিত করতেন।
বিনম্রতা ও শরণাগতি বলতে যে কোনো ব্যক্তিত্বের যে কোনো নির্দেশকে অন্ধভাবে অনুসরণ করাকে বোঝায় না। যখনই মনে কোনো দ্বিধা উপস্থিত হবে অবিলম্বেই আমাদের আধ্যাত্মিক গুরু বা তাঁর প্রতিনিধিদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া উচিত। কিন্তু সেই প্রশ্ন তার্কিক ভঙ্গিতে নয়, অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে উপস্থাপন করা উচিত। ভগবদ্গীতায় ৪.৩৪ শ্রীকৃষ্ণ আমাদের  লেছেন, ‘গুরুর কাছে বিনম্রভাবে সেবা করে তবেই তার কাছে কোনো সত্যের অনুসন্ধান করার চেষ্টা কর। তিনি আত্মতত্ত্ব জ্ঞানী এবং সত্যদ্রষ্টা। তাই তিনি তোমাকে জ্ঞান দান করতে পারেন।’
আমাদের আধ্যাত্মিক দীক্ষাগুরুর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের কখনোই মনে করা উচিত নয় যে, আমাদের গুরু অন্যান্য স্বীকৃত গুরুর থেকে উন্নত। আমাদের কখনোই অন্যান্য আধ্যাত্মিক গুরুদের স্বল্প দক্ষ মনে করা উচিত নয়। যদি আমরা তা না করি তাহলে আমরা বিরাট অপরাধ করব। গুরুভ্রাতাদের প্রতি অসম্মানেও আধ্যাত্মিক গুরু অসন্তুষ্ট হন, যা আমাদের কৃষ্ণকৃপা প্রাপ্তি থেকে বিরত করবে।
শ্রীমদ্ভাগবতে বলছে: ধর্মংস্তু সাক্ষাৎ ভগবৎপ্রণীতম্। ধর্মের পথ স্বয়ং ভগবান প্রবর্তিত করেছেন। সুতরাং ভগবান হলেন মূল আধ্যাত্মিক গুরু এবং আধ্যাত্মিক গুরুজন গুরুপরম্পরা ধারার মাধ্যমে স্বয়ং পরমেশ^র ভগবানেরই প্রচার করছেন। সুতরাং যদি আমরা শ্রীকৃষ্ণকে জানতে চাই এবং  শ্রীকৃষ্ণের ধামে প্রত্যাগমন করে তাঁর সান্নিধ্য পেতে চাই তাহলে অবশ্যই আমাদের আধ্যাত্মিক গুরু গ্রহণ করতে হবে। তাঁর কাছে বিনম্রভাবে শরণাগত হয়ে তাঁর নির্দেশাবলি নিজেদের জীবনে যথাযথভাবে পালন করতে হবে। আমাদের আধ্যাত্মিক গুরুই হলেন আমাদের আধ্যাত্মিক পিতা এবং তিনিই জানেন কোনটি আমাদের পক্ষে সর্বোত্তম।

0 Comments