শ্রীমতী সীতাদেবীর অগ্নিপরীক্ষা

শ্রীরামায়ণে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র কর্তৃক সীতামাতার অগ্নিপরীক্ষা এক দুঃখজনক অধ্যায়। হয়তো এটি মনে হতেই পারে শ্রীরাম সীতাদেবীর সঙ্গে অন্যায় করেছেন। কিন্তু আমরা জানি, ভগবান কখনও অন্যায় করতে পারেন না। তাহলে কী এই অগ্নিপরীক্ষার পেছনের ইতিহাস?

sita_devi

পরমেশ্বর ভগবান শ্রীরামচন্দ্র চিন্ময় জগতে অযোধ্যাধামে নিত্যকাল সীতাদেবীর সহিত বাস করেন। ত্রেতাযুগে সকল পরিকর সঙ্গে নিয়ে রামচন্দ্র অবতীর্ণ হন। রামচন্দ্র হচ্ছেন মর্যাদা পুরুষোত্তম, যিনি ধর্মীয় মর্যাদা ও আচরণ এবং দায়িত্ব ও কর্তব্যের শিক্ষা প্রদান করেন। সীতাদেবীও রামচন্দ্রের অন্তরঙ্গা শক্তিরূপে রামচন্দ্রের ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করেন। সীতাদেবী কোনো সাধারণ নারী নন, এমনকি জাগতিক নারীও নন। তিনি ভগবানের অন্তরঙ্গা শক্তি। রামচন্দ্রের সঙ্গিনী রূপে তিনি মিথিলানগরে রাজা জনকের যজ্ঞক্ষেত্র কর্ষণকাজে ব্যবহৃত লাঙলের হলরেখা থেকে বৈশাখের শুক্লানবমী তিথিতে (রামনবমীর পরবর্তী শুক্লা নবমীতে) আবির্ভূত হন। শ্রীরামচন্দ্রের সঙ্গে কারুণ্যরস প্রকাশ করে ভক্তদের আনন্দ প্রদান, রামচন্দ্রের লীলায় সহায়তা, রাবণের ধ্বংস প্রভৃতি উদ্দেশ্যে তিনি অবতীর্ণ হন।
সতী সীতাদেবী রামচন্দ্রের সঙ্গে বনবাসে গমন করে এক আদর্শ সহধর্মিণীর ধর্ম কর্তব্য শিক্ষা প্রদান করেন। অনুরূপভাবে রামচন্দ্রও আদর্শ পতির ন্যায়ই আচরণ করেন। তিনি সীতাদেবীকে সুরক্ষিত রাখেন। তিনি রাবণ কর্তৃক সীতাহরণের পূর্বেই অগ্নি প্রজ্বালনের মাধ্যমে অগ্নিদেবকে সীতার সুরক্ষার জন্য নিয়ে যান। অগ্নিদেব মাতা সীতাকে তার পত্নীর সুরক্ষায় রাখেন আর নিজ কন্যা বেদবতীকে সীতার অবয়ব প্রদান করে মায়াসীতারূপে রামচন্দ্রকে দেন। অতঃপর রামচন্দ্র মায়াহরিণরূপী মারীচকে অন্বেষণ করতে গেলে রাবণ সীতা ভেবে এই মায়াসীতাকেই হরণ করে। কিন্তু সেখানে যদি মূল সীতাদেবী থাকতেনও, রাবণের ন্যায় পাপিষ্ঠ অসুরের পক্ষে ভগবানের অন্তরঙ্গা শক্তিকে হরণ করা তো দূরের কথা, স্পর্শই করতে সক্ষম হতো না। কিন্তু রাবণ সীতা হরণ না করলে রাবণ-বধের জন্য উপযুক্ত লীলা সম্পাদন সম্ভব হতো না বলে মায়াসীতার আবির্ভাব। পরবর্তীতে অগ্নি-পরীক্ষার সময় মায়াসীতা নিজস্থানে চলে যান আর সীতাদেবী আবির্ভূত হন। এ প্রসঙ্গে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন,

রাবণের পক্ষে সীতা অপহরণ অসম্ভব। সে প্রকৃতপক্ষে মায়াসীতাকে হরণ করেছিল। অগ্নিপরীক্ষার সময় মায়াসীতা অদৃশ্য হয়ে যায় আর প্রকৃত সীতা আবির্ভূত হন। এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত যে, স্ত্রীলোক যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তাকে সুরক্ষা প্রদান করা উচিত। অন্যথায় রাবণের ন্যায় অসুরেরা তা ক্ষতি সাধন করতে পারে। রামচন্দ্রের সাথে বিবাহের পূর্বে সীতা জনক কর্তৃক সুরক্ষিত ছিলেন এবং বিবাহের পর স্বামী কর্তৃক সুরক্ষিত ছিলেন। তাই নারীদের সর্বদা সুরক্ষা প্রদান করতে হবে।
বৈদিক রীতি হচ্ছে নারী কখনও অসুরক্ষিত থাকবে না। শৈশবে পিতা ও ভ্রাতার দ্বারা, যৌবনে স্বামীর দ্বারা, বৃদ্ধাবস্থায় পুত্র ও নাতির দ্বারা এবং তাদের অবর্তমানে ভ্রাতার দ্বারা সুরক্ষিত হবেন। আর এটি প্রকাশ করতেই মায়াসীতার আয়োজন। 
আবার রাবণ-বধের পর রামচন্দ্র একজন আদর্শ রাজার ন্যায় আচরণ করেন। একজন ন্যায়পরায়ণ রাজাকে হতে হবে নিষ্কলঙ্ক। তাই তিনি কারও কোনো সন্দেহের অবকাশ না রাখার জন্য সীতাকে অগ্নিপরীক্ষা করেন। যদিও সীতাদেবী ছিলেন সর্বাবস্থাতেই সতীসাধ্বী, তবুও রামচন্দ্র যদি এটি না করতেন, তবে ভবিষ্যতের রাজাগণ এই অজুহাতে এবং নিজেদের ক্ষমতার অপব্যবহারের ফলে দোষ থাকা সত্তে¡ও অনাচারে রত হতো। আবার রামচন্দ্র যেহেতু ত্যাগ ও তিতিক্ষার মাধ্যমে করুণ রস প্রকাশ করেছেন, সীতার অগ্নিপরীক্ষা এবং এজন্য সারা জগতের হাহাকার এই রসেরই পুষ্টি সাধন করেছে। 
অতঃপর যখন (মায়া) সীতাদেবী স্বাচ্ছন্দ্যে অগ্নিতে প্রবেশ করেন, হঠাৎ দশদিক আলোকিত হয়ে উঠল এবং প্রকৃত সীতাদেবী প্রকাশিত হলেন। ব্রহ্মা, শিব প্রভৃতি দেবগণ আকাশে উপস্থিত হয়েএ দৃশ্য দর্শন করতে লাগলেন। ব্রহ্মাজি তখন রামচন্দ্রকে আদিপুরুষ শ্রীকৃষ্ণের প্রকাশ এবং রাধারানীর প্রকাশরূপে সীতাদেবীকে ঘোষণা করলেন। বিশ্বস্বাক্ষী অগ্নিদেব সীতার সতীত্বের কথা ঘোষণা করার মাধ্যমে যখন এই লীলার উদ্দেশ্য সাধিত হলো তখন শ্রীরামচন্দ্র বলতে লাগলেন, “হে অগ্নিদেব, সীতার সতীত্ব ও বিশুদ্ধতা প্রমাণের জন্য এই পরীক্ষা আবশ্যক ছিল। আমি যদি তা করা থেকে বিরত থাকতাম, তবে লোকের আমাকে উপহাস করত, কামুক মনে করত। সত্যি কথা হচ্ছে, আমি সীতার চরিত্র সম্পর্কে অবগত। আর রাবণ কখনও তাকে দূষিত করতে পারে না। সীতা নিজ ধর্মের বলেই রক্ষিতা। তাঁর সতীত্ব প্রমাণ করতে দৃশ্যত আমি তা আয়োজন করেছি। সীতা আমার থেকে অভিন্না এবং আমার অন্তরঙ্গা শক্তি। ঠিক যেমন সূযালোক সূর্য থেকে অভিন্ন, সীতা ও আমার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।” এভাবে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীরামচন্দ্র, তাঁর নিত্যসঙ্গিনী সীতাদেবী এই লীলার মাধ্যমে ভক্তির করুণ রস প্রকাশ ও বৈদিক অনুশাসন এবং মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করলেন। 
~মাধুর্য দাস

0 Comments