ঐকান্তিক অন্বেষীদের দেবতারাও সাহায্য করে সন্তুষ্ট হন

hksamacar-blog
দেবতারা সর্বদাই জড়জাগতিক ব্যক্তিদের জাগতিক প্রত্যাশার দ্বারা বিরক্ত হন, তাদের বাসনার তালিকাটি সীমাহীন। তারা এই ধরনের লোকদের প্রতি মাঝে মাঝে তীব্রভাবে বিরক্ত হয়ে যান, কেননা এই ধরনের লোকেরা তাদের জড়-জাগতিক বর লাভ করার জন্য সীমাহীনভাবে বিরক্ত করতে থাকে। কিন্তু যখন একজন ভক্ত দেবতাদের কাছে যান এবং পরামর্শ প্রত্যাশা করেন যে কীভাবে তিনি কৃষ্ণসেবা করতে পারেন, তখন দেবতারা খুব আনন্দ অনুভব করেন এবং সেই সমস্ত ভক্তদের অনুরোধকে পূর্ণ করতে খুব সন্তুষ্টি অনুভব করেন।
একবার একজন ভক্ত ঐকান্তিকভাবে শিবের আরাধনা করেছিলেন এবং এইভাবে তিনি শিবের দর্শন লাভ করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। তাঁর আরাধ্য প্রভুর দর্শন করে সেই ভক্তটি তাঁর কাছে ভিক্ষা করলেন যে, তিনি যেন তাঁর কাছে এই ব্রহ্মাণ্ডের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বা সবথেকে চমৎকার বস্তুটি তাকে প্রদান করেন।
শিব তখন বললেন, “কোনো সমস্যা নেই। আমি তোমাকে দিতে পারি, তোমাকে শুধু সনাতন গোস্বামীর কাছে যেতে হবে।”
 “হে আরাধ্য প্রভু, আমি একটি পরশ পাথর লাভ করতে চাই।”
“ও, তোমার পরশপাথর চাই? চিন্তা করো না। এই সাধুর কাছে এরকম একটি পরশপাথর রয়েছে, তুমি শুধু বৃন্দাবনে তাঁর কাছে যাও এবং গ্রহণ করো।”
শিবের এই ভক্তটি বৃন্দাবনে সনাতন গোস্বামীর কাছে গেলেন, এবং তাঁর শ্রীচরণে পতিত হয়ে প্রার্থনা করলেন, “হে সনাতন গোস্বামী! শিব ঠাকুর আমাকে বলেছেন যে, আপনার কাছে এই বিশ্বের সবথেকে চমৎকার বস্তুটি রয়েছে, আমি বুঝতে পারছি যে আপনার কাছে একটি পরশপাথর রয়েছে।”
গোস্বামী তখন বললেন, “স্থির করো তোমার কী চাই।”
সেই ভক্ত তখন তৎক্ষণাৎ বললেন, “একটি পরশপাথর চাই।” পরশপাথরটি আসলে কল্পবৃক্ষের মতো, যার এমন শক্তি আছে যা যেকোনো বস্তুর সাথে পরশ করলে তা সোনায় পরিণত হয়ে যায়। সেহেতু, একজন জাগতিক ব্যক্তির কাছে এটি খুবই উপকারী। যদি এটি অন্যকিছুকে স্পর্শ করে তাহলে সেটি সোনায় পরিণত হয়।
সনাতন গোস্বামী তখন বললেন, “ঠিক আছে, তুমি ঐদিকে যাও, সেখানে তুমি একটি আবর্জনার স্তূপের মাঝে একটি পরশপাথর খুঁজে পাবে। সেখানে খোঁজ করো।” একথা বলেই গোস্বামী তাঁর পূজা শুরু করলেন। এই ভক্তটি খুব উৎসাহের সাথে পিছন দিকে ছুটে গেলেন এবং সেখানে আবর্জনার স্তূপ দেখতে পেলেন, আর সেই আবর্জনার স্তূপে তিনি দুই হাত দিয়ে খুঁজতে শুরু করলেন। সেই আবর্জনাগুলোকে সরিয়ে পরশপাথর খুঁজতে লাগলেন। তার আঙুলে কিছু একটা শক্ত জিনিসের ছোঁয়া লাগল, সেটি টেনে বের করলেন এবং সে সেই পরশপাথরটি দেখতে পেলেন।
আবেগ আপ্লুত হয়ে তিনি চিৎকার করতে লাগলেন, “সোনা! সোনা! সোনা! সোনা! আমি ধনী, আমি ধনী হয়ে গেছি!” সোনার মূল্য লক্ষ লক্ষ ক্রুগারের থেকেও অনেক অনেক বেশি! সর্বত্র সোনা! সে একটি স্বর্ণ উৎপাদনকারী পাথর পেয়ে খুব খুশি ছিল!
কিন্তু হঠাৎ করে তার মাথায় একটি অদ্ভুত বিষয় এলো। ভক্তটি চিন্তা করলেন, “এমন কি কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের ব্যক্তি আছেন যিনি একটি আবর্জনা স্তূপের মধ্যে পরশপাথরের মতো এত মূল্যবান কিছু ফেলে দেবেন?”
“নিশ্চিতভাবে, এই সাধুর কাছে এই পরশপাথরের থেকেও অধিক কোনো গুরুত্বপূর্ণ বস্তু আছে? এই সাধুটি আমার কাছ থেকে কি সেই মূল্যবান সম্পদটি এখনও লুকিয়ে রাখছেন? আমাকে অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে।” তিনি তৎক্ষণাৎ সনাতন গোস্বামীর কাছে দৌড়ে গেলেন এবং বললেন, “হে মহাত্মা, আমি এই পরশপাথরটি আবর্জনা স্তূপে খুঁজে পেয়েছি, এবং সেই কারণে আমার সংশয় হচ্ছে যে, এটিই আসলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস কিনা; প্রকৃতপক্ষে আমি এটি নিশ্চিত যে, আপনার কাছে এর থেকেও মূল্যবান কিছু একটি আছে। অনুগ্রহ করে আপনি আমাকে করুণা করুন এবং আমাকে সেই মূল্যবান বস্তুটি দিন।”
“হ্যাঁ অবশ্যই, আমার কাছে এর থেকে লক্ষ লক্ষ গুণ বেশি মূল্যবান আর একটি বস্তু আছে।” “ও তাই নাকি, খুব চমৎকার! আমি কি এই পরশপাথরের পরিবর্তে সেটি পেতে পারি?”
“কেন পার না? কিন্তু তোমাকে এই পরশপাথরটিকে প্রথমে দূরে ছুড়ে ফেলে দিতে হবে।”
“আমাকে এই স্বর্ণ-উৎপাদনকারী পাথরটিকে ফেলে দিতে হবে?”
“হ্যাঁ, অবশ্যই, যদি তুমি সবথেকে মূল্যবান বস্তুটি চাও, তাহলে তুচ্ছ জিনিসের প্রতি তোমার আসক্তি থাকতে পারে না।”
“ঠিক আছে, আপনি একবার আমাকে সঠিক রাস্তা দেখিয়েছিলেন, আর এভাবে আপনি আবার সঠিক রাস্তাই দেখাবেন। আপনার প্রতি আমার বিশ্বাস আছে।”
এই ভক্ত তখন আবার সেই আবর্জনার স্তূপে ফিরে গেলেন, এবং সেই পরশপাথরটিকে আবার সেখানে ফেলে দিয়ে চলে এলেন। তাঁকে দ-বৎ প্রণতি নিবেদন করে আবার তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কৃপা করে আপনি আমাকে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস প্রদান করুন।”
সনাতন গোস্বামী বললেন, “ঠিক আছে, এখানে এসো এবং সতর্কতার সাথে শ্রবণ করো। হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে। হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে ॥
অবশেষে সনাতন গোস্বামী বললেন, “এই মহামন্ত্র হলো ভগবানের দিব্য নাম, এই নাম জপ করো, এটি তোমার সমস্ত বাসনা পূর্ণ করবে।”
এভাবেই, শিবঠাকুর এই ভক্তটিকে সুখের সঠিক পথে পরিচালিত করলেন, যে পথ থেকে এই ভক্তটি বিপথে পরিচালিত হয়ে জড়জাগতিক সম্পদের দিকে যাওয়ার ভুল করতে চলেছিলেন। যেহেতু ধ্রুব মহারাজ এটি বুঝতে পেরেছিলেন, তাই তিনি কৃষ্ণকে কল্পবৃক্ষ বলে সম্বোধন করেছিলেন, এবং তিনি নিজে এই জড়জগতের বিশাল রাজ্যরূপী তুচ্ছ বর প্রার্থনা করার জন্য নিজেকে তিরস্কার করছিলেন। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে তাঁর কর্তব্য ছিল কেবল কৃষ্ণের ইচ্ছে পূর্ণ করা। আর ধ্রুব মহারাজ অনুধাবন করেছিলেন যে, তিনি পরোক্ষভাবে কৃষ্ণকেই লাভ করার চেষ্টা করেছিলেন এবং প্রত্যক্ষ পন্থাটি হচ্ছে কেবল সদ্গুরুর নির্দেশ পালন করা, যার মাধ্যম কৃষ্ণ খুব প্রসন্ন হবেন এবং তিনি তাঁর কাছে উপস্থিত হবেন।

- শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজ

0 Comments