-->

সর্বজগতের গুরু শিব

শ্রীমদ্ভাগবতে (শ্রীমদ্ভাগবত ৪.২.২) শ্রীশিবের মহিমা বর্ণনা করে উক্ত হয়েছে~
কস্তং চরাচরগুরু নির্বৈরং শান্তবিগ্রহম্। 
আত্মারামং কথং দ্বেষ্টি জগতো দৈবতং মহৎ।।
~ সমগ্র জগতের গুরু শিব নির্বৈরী, শান্ত এবং আত্মারাম। তিনি সমস্ত দেবতাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ (দেবাদিদেব)।”  

নানাশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছে, শ্রীশিব বহু বিখ্যাত বৈষ্ণবকে কৃষ্ণভাবনামৃতের জ্ঞান প্রদান করেছেন। শ্রীনারদপঞ্চরাত্রে বর্ণিত হয়েছে, শ্রীনারদ লোকপিতামহ ব্রহ্মার নিকট কৃষ্ণভাবনামৃত লাভ করে বদ্রীনাথে গমনপূর্বক তপস্যা শুরু করলে দেবী সরস্বতী কর্তৃক এক আকাশবাণী শুনতে পান~
আরাধিতো যদি হরিস্তপসা ততঃ
 কিং নারাধিতো যদি হরিস্তপসা ততঃ কিম্।
অন্তর্বহির্যদি হরিস্তপসা ততঃ কিং 
নান্তর্বহির্যদি হরিস্তপসা ততঃ কিম্ \
~ যদি শ্রীহরিকে আরাধনা করা হয়, যদি শ্রীহরি অন্তরে ও বাহিরে বিরাজিত না হন, তবে আর তপস্যার কী প্রয়োজন, আর যদি হরি আরাধিত না হন, অন্তরে, বাহিরে বিরাজিত না হন, তবে এমন তপস্যায় লাভ কী?” (না.প. ২.৬) এরপর দৈববাণী তাঁকে জ্ঞানসাগর শ্রীশঙ্করের নিকট গমন করতে নির্দেশ দেন। মার্কণ্ডেয় পুরাণমতে সরস্বতীদেবী এবং শিব উভয়ই সমস্ত জ্ঞানময় ও জ্ঞানপ্রদাতা। দেবী সরস্বতী উপাসকভেদে কর্ম, জ্ঞান এবং ভক্তিশাস্ত্র প্রদান করে থাকেন, কিন্তু শ্রীশিব শুদ্ধ কৃষ্ণভক্তিশাস্ত্রীয় জ্ঞানই প্রদান করেন। 

অতঃপর নারদ মুনি যখন কৈলাসে পৌঁছলেন, তখন তিনি নানা রত্নবিভূষিত, নানা পুষ্পশোভিত এবং সাতটি দ্বারযুক্ত শিবের আলয় দেখতে পেলেন। সেখানে নারদ শ্রীবিগ্রহশোভিত ও শ্রীবৃন্দাবনের অনুরূপ একটি কৃত্রিম বৃন্দাবন দেখতে পেলেন, যেখানে শ্রীকৃষ্ণের বিভিন্ন লীলা প্রদর্শিত হয়েছে। সেখানে তিনি শ্রীগণেশকে কৃষ্ণভজনরত দেখলেন। তিনি শিবকে ব্যঘ্রচর্ম পরিহিত, প্রসন্নবদন, শান্ত, বিভ‚তিভ‚ষণ, গঙ্গা ও জটাধর, ভক্তপ্রিয়, ত্রিনয়ন, পঞ্চমুখ এবং শ্রীকৃষ্ণমন্ত্র জপে রত, অতুল ঐশ^র্যের মধ্যেও বৈরাগ্যভাবপূর্ণ দেখলেন। পার্বতীদেবী শিবের সেবারত। নারদ শিবকে প্রণাম ও স্তব করলে শিব তাঁকে বর প্রার্থনা করতে বললেন,
 “আমি ইন্দ্রত্ব, মোক্ষ, ব্রহ্মত্ব, অষ্টসিদ্ধি প্রভৃতি দুর্লভ জাগতিক বর প্রদান করি। আমি সবল অভীষ্ট পূর্ণকারী স্থির অবিনাশী শ্রীহরিভক্তির মহাদুর্লভ বরও দান করি। তুমি কী প্রার্থনা কর?” (না.প. ৮.২১-২৬) শ্রীনারদ তখন প্রার্থনা করলেন,
দেহি মে হরিভক্তিঞ্চ তন্নামসেবনে রুচিঃ। 
অতিতৃষ্ণা গুণাখ্যানে নিত্যমস্তু মমেশ্বর ।।
~ “হে প্রভু! আমি শ্রীকৃষ্ণচরণে অনন্যা ভক্তি, নামকীর্তনে অনন্যা রুচি ও তৃষ্ণা প্রার্থনা করি।” 
তখন উপস্থিত শিব, পার্বতী, গণেশ, কার্তিক সকলে আনন্দিত হয়ে হাস্য করলেন। শ্রীশিব নারদের অভীষ্ট পূর্ণ করে বললেন, 
আহা! যারা জিতেন্দ্রিয় হয়ে সর্বদা শ্রীহরিচরণে অহৈতুকী ভক্তি করেন, সেই বৈষ্ণবগণের মহিমা অদ্ভূত। লক্ষ্মী, ব্রহ্মা, অনন্ত ও সুরগণবন্দিত শ্রীপদ্মনাভের শ্রীচরণপদ্ম যারা দিবানিশি ধ্যান করেন, তাঁদের মহিমা পরম অদ্ভ‚ত। তীর্থসমূহ এবং ভক্তমণ্ডল সর্বদা তাঁদের চরণধূলি বাঞ্ছা করেন। তাঁদের চরণজলই পৃথিবীকে পরিশুদ্ধ করে। বৈষ্ণব কর্তৃক শ্রীহরিকীর্তন যাঁর কর্ণে প্রবেশ করে, সেও বৈষ্ণব হয়। কৃষ্ণনামপ্রভাবে জীব পিতা, মাতা ও শ^শুরকুলের শত শত পূর্বপুরুষ উদ্ধার করতে পারেন।” (না.প. ৯.১৭-৩০) 
এরপর শিব নারদকে শ্রীকৃষ্ণের অর্চনার বিভিন্ন মন্ত্র প্রদান করেন। 

শ্রীমদ্ভাগবতে বর্ণিত হয়েছে  স্বায়ম্ভূব মনুর বংশধর রাজা প্রাচীনবর্হিষতের দশজন পুত্র ছিল যারা সকলেই প্রচেতা নামে পরিচিত ছিলেন। তারা সকলেই পূর্বকর্মপ্রভাবে শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশে তপস্যায় রত হয়েছিলেন। যখন তারা তপস্যার উদ্দেশে গমন করেছিলেন, তখন তাঁদের সঙ্গে মহাদেবের দেখা হয়েছিল, যিনি অত্যন্ত কৃপাপূর্বক তাঁদের পরমতত্ত¡জ্ঞান প্রদান করেছিলেন। এই ঘটনায় মৈত্রেয় ঋষিকে বিদুর প্রশ্ন করেন, “জড়দেহের বন্ধনে আবদ্ধ জীবেদের পক্ষে শিবের সাক্ষাৎলাভ করা অত্যন্ত দুর্লভ। এমনকি জড় আসক্তি থেকে মুক্ত ও সর্বদা তাঁর ধ্যানে মগ্ন মহর্ষিরাও তাঁর সঙ্গলাভ করতে পারেন না। তবে প্রচেতাগণ কীভাবে তাঁর কৃপাপ্রাপ্ত হলো?” তখন মৈত্রেয় বিশ্লেষণ করে বলেন, “কেবল সাধুচরিত্র এবং কৃষ্ণভাবনার প্রতি আসক্তির কারণে তাঁরা এরকম সৌভাগ্য প্রাপ্ত হন।” শ্রীশিব প্রচেতাগণকে বলেন~

যঃ পরং রংহসঃ সাক্ষাৎত্রিগুণাজ্জীবসংজ্ঞিতাৎ। 
ভগবন্তং বাসুদেবং প্রপন্ন স প্রিয়ো হি মে  ।।
~ “যে ব্যক্তি জড়াপ্রকৃতি ও জীব-আদি সমস্ত কিছুর নিয়ন্তা পরমেশ^র ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত, তিনি আমার অত্যন্ত প্রিয়। মানুষ শতজন্ম ধরে যথাযথভাবে স্বধর্ম আচরণ করার ফলে ব্রহ্মপদ প্রাপ্ত হওয়ার যোগ্য হন, এবং তার থেকেও অধিক যোগ্যতা অর্জন করে তিনি আমাকে (শিবকে) লাভ করতে পারে। কিন্তু সেই ব্যক্তি যদি অনন্যা ভক্তিসহকারে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত জন, তিনি অচিরেই চিৎজগতে উন্নীত হন। তোমরা সকলেই ভগবানের ভক্ত। আমি জানি, কৃষ্ণভক্তগণ আমাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করেন, আমি তাঁদের অত্যন্ত প্রিয়। তাঁরাও আমার অত্যন্ত প্রিয়।” (শ্রীমদ্ভাগবত ৪.২৪.২৮-৩০) 
এভাবে শ্রীশিব কৃষ্ণভক্তির মহিমা বর্ণনা করেন এবং প্রচেতাগণকে শ্রীকৃষ্ণভজনের পন্থা প্রদর্শন করেন, ভগবানের সৌন্দর্য, সেবা, দিব্যনাম কীর্তনের পদ্ধতি আলোচনা করেন, যার ফলে তাঁরা অচিরেই শ্রীহরির সাহচর্য লাভ করেন। 
(সংকলনে : মাধুর্য্য দাস)

0 মন্তব্য