-->

চন্দনযাত্রা | গোপীনাথের অঙ্গে চন্দন লেপন উৎসব


chandan-yatra
শ্রীনীলাচলপতি পরম পুরুষোত্তম শ্রীজগন্নাথদেব তাঁর সেবক শ্রীইন্দ্রদ্যুম্ন রাজাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন-
বৈশাখস্য সিতে পক্ষে তৃতীয়াক্ষয়সংজ্ঞিকা।
তত্র মাং লেপয়েদ গন্ধলেপনৈরতিশশোভনম্ ॥
“বৈশাখ মাসের শুক্ল পক্ষে অক্ষয় তৃতীয়া নামক তিথিতে সুগন্ধি চন্দন দিয়ে আমার অঙ্গে লেপন করবে।” (উৎকল খণ্ড ২৯ অধ্যায়) সেই অনুসারে আজও অক্ষয়তৃতীয়া তিথি থেকে শুরু করে জ্যৈষ্ঠ মাসের অষ্টমী তিথি পর্যন্ত প্রতিদিন শ্রীহরির অঙ্গে সুগন্ধি চন্দন লেপন করা হয়।
শ্রীল মাধবেন্দ্রপুরীপাদ যিনি ছিলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর গুরুদেব শ্রীল ঈশ্বর পুরীপাদের গুরু। সেই শ্রীর মাধবেন্দ্রপুরী ব্রজধামে মাটি খুঁড়ে একটি সুন্দর কৃষ্ণবিগ্রহ উত্তোলন করেছিলেন। সেই বিগ্রহের নাম গোবর্ধনধারী গোপাল। মাধবেন্দ্রপুরী দুই বৎসরকাল সনিষ্ঠ সেবাযত্ন করবার পর একদিন গোপালের নির্দেশ প্রাপ্ত হলেন-“আমার অঙ্গের তাপ দূর হচ্ছে না, যদি মলয়জ চন্দন এনে আমার অঙ্গে লেপন কর তবে তাপ দূর হবে।”
শ্রীগোপালের নির্দেশ পেয়ে মাধবেন্দ্রপুরীপাদ গোপালের সেবায় একজন উপযুক্ত সেবককে নিয়োগ করে মলয়জ চন্দন সংগ্রহের জন্য পূর্বদেশে যাত্রা করলেন। মলয় দেশের চন্দন। মলয় দেশের বর্তমান নাম মালাবার দেশ। এটি পশ্চিমঘাট পর্বতমালার দক্ষিণে অবস্থিত। নীলগিরিকে কেউ মলয় পর্বত বলেন। মাধবেন্দ্রপুরী গৌড়দেশের শান্তিপুরে এসে অদ্বৈত আচার্যকে দীক্ষাদান করে বালেশ্বরর রেমুণায় গোপীনাথ বিগ্রহ দর্শন করে নীলাচলে গেলেন। জগন্নাথ পুরী মন্দিরে গিয়ে জগন্নাথের সেবক ও ভক্ত মোহান্তকে গোপালের বৃত্তান্ত জানিয়ে মলয়জ চন্দন সংগ্রহ করে দিতে প্রার্থনা নিবেদন করেন।
ভক্তগণ পুরীপাদকে চন্দন কর্পূর সংগ্রহ করে দিলেন। দু’জন সেবক এবং সরকারী ছাড়পত্র সবকিছুর ব্যবস্থাও তাঁকে করে দিলেন। পুনরায় ফিরবার পথে মাধবেন্দ্রপুরীপাদ রেমুণার গোপীনাথ মন্দিরে এলেন। গোপীনাথ দর্শনে আনন্দিত হয়ে তিনি নৃত্যকীর্তন করলেন। পূজারী প্রদত্ত ক্ষীরপ্রসাদ পেয়ে তিনি সেখানে বিশ্রাম নিলেন।
রাত্রে তাঁর আরাধ্য গোপালের দ্বার স্বপ্নাদিষ্ট হলেন-
“গোপাল আসিয়া কহে- শুনহ মাধব।
কর্পূর চন্দন আমি পাইলাম সব ॥
কর্পূর সহিত ঘষি এসব চন্দন।
গোপীনাথের অঙ্গে সব করহ লেপন ॥”
গোপীনাথ আমার সে একই অঙ্গ হয়।
ইহাকে চন্দন দিলে, আমার তাপ ক্ষয় ॥
দ্বিধা না ভাবিহ, না করিহ কিছু মনে।
বিশ্বাস করি চন্দন দেহ আমার বচনে ॥”
তার পরদিন শুরু হলো গোপীনাথের অঙ্গে চন্দন লেপন উৎসব। রেমুণাবাসী ভক্তবৃন্দ সবাই চন্দনযাত্রা দর্শনে উৎফুল্ল হলেন। যতদিন চন্দন শেষ না হয় ততদিন সেইসব চন্দন ঘসে ঘসে কর্পূর মিশিয়ে গোপীনাথের অঙ্গে লেপন করা হলো। প্রখর গ্রীষ্মের দিনগুলোতে ভগবানের শ্রীঅঙ্গ শীতল করার সে এক অদ্ভুত দিব্যলীলা। এই চন্দনসেবায় যুক্ত হয়ে মানুষ কৃষ্ণ পাদপদ্মে ভক্তি লাভ করেন।
চন্দনযাত্রার সময় প্রতিদিন বিকেল বেলায় শ্রীজগন্নাথদেবের বিজয় বিগ্রহ স্বরূপ শ্রীমদনমোহনকে শ্রীমন্দির থেকে বিমানে চড়িয়ে শ্রীনরেন্দ্র সরোবরের তীরে নিয়ে আসা হয়। নরেন্দ্রসরোবরের ¯িœগ্ধ জলে মদনমোহনের নৌকবিলাস শুরু হয়।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর পার্ষদদের নিয়ে সেই সময় জলে নামতেন। জলকেলি, হরিধ্বনি, নানা বাদ্যঝংকার, ছাত্র, পতাকা, চামর ব্যজন সবমিলিয়ে সে এক মহানন্দময় পরিবেশ সৃষ্টি হতো। উড়িয়া - গৌড়ীয়া সমস্ত বৈষ্ণব একই সঙ্গে কৃষ্ণকোলাহল শুরু করতে থাকেন।
শ্রীল বৃন্দাবন দাস ঠাকুর লিখেছেন-
শুন ভাই! শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য অবতার।
যেরূপে নরেন্দ্রজলে করিলা বিহার ॥
পূর্বে যমুনায় যেন শিশুগণ মেলি।
মালী করিয়া করিলেন জলকেলি ॥
সেইরূপে সকল বৈষ্ণবগণ মেলি।
পরস্পর করে ধরি হইলা োলী ॥
শ্রীধাম মায়াপুরে শ্রীমায়াপুর চন্দ্রোদয় মন্দির থেকেও শ্রীরাধামাধবও প্রতিবছর চন্দনযাত্রার সময় নৌবিহারে বহির্গত হন। শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের সমাধি মন্দির সংলগ্ন পুষ্করীনিতে নৌকাবিহারের আয়োজন করা হয়।
শ্রীহরির এসকল অনুষ্ঠান করার আর কি কথা, কেবল ভক্তিভরে শ্রবণ করলেই জীব ভব বন্ধন থেকে মুক্ত হন।
এসকল লীলা জীব উদ্ধার কারণে।
কর্মবন্ধন ছিন্নে উহার শ্রবণে পঠনে ॥
(শ্রীচৈতন্য ভাগবত - অন্ত্য ১৪১)

-শ্রীমান সনাতন গোপাল দাস ব্রহ্মচারী

0 মন্তব্য