পণতীর্থ ধামে মাহাত্ম্য ও মহাবারুণি স্নান

অদ্বৈতং হরিণাদ্বৈতাদাচার্যং ভক্তিশংসনাৎ।
ভক্তাবতারমীশং তমদ্বৈতাচার্যমাশ্রয়ে ॥
অনুবাদ : ভগবান শ্রীহরি থেকে অভিন্ন তত্ত্ব বলে তাঁর নাম অদ্বৈত এবং ভক্তিতত্ত্ব শিক্ষা দেন বলে তিনি আচার্য নামে খ্যাত, সেই ভক্ত অবতার শ্রীঅদ্বৈত আচার্য ঈশ্বরকে আমি আশ্রয় করি।
শ্রীবিষ্ণুতত্ত্ব অদ্বৈতাচার্য প্রভু গৌরআনা ঠাকুর নামে সকলের কাছে পরিচিত। তিনি মহাবিষ্ণু, তিনি সদাশিব, তিনি আচার্য। ঈশ্বর অদ্বৈতাচার্যের তত্ত্ব ও মহিমা সাধারণ জীবের ধারণার অতীত।

hksamacar

এ সম্পর্কে শ্রীগৌরগণোদ্দেশ দীপিকায় (১১) বলা হয়েছে- ভক্তাবতার আচার্যোহদ্বৈতো যঃ শ্রীসদাশিবঃ অর্থাৎ যিনি সদাশিব, তিনিই ভক্তাবতার রূপে শ্রীঅদ্বৈতাচার্য।
বঙ্গদেশে শ্রীহট্ট নিকট নবগ্রাম।
 ‘কুবের পণ্ডিত’ তথা নৃসিংহসন্তান ॥
 কুবের পণ্ডিত ভক্তিপথে মহাধন্য।
 কৃষ্ণপাদপদ্ম বিনা না জানয়ে অন্য ॥
 তৈছে তাঁর পত্নী ‘নাভাদেবী’ পতিব্রতা।
 জগতের পূজ্যা, যেঁহো অদ্বৈতের মাতা ॥
(ভক্তিরত্নাকর ৫/২৪১-৪৩)
মহাপ্রভুর অন্তরঙ্গ পার্ষদ শ্রীঅদ্বৈত আচার্য প্রভু আবির্ভূত হন বর্তমান সিলেট বিভাগের অন্তর্গত সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর থানার লাউড় পরগণার অন্তর্গত নবগ্রামে। আনুমানিক ১৪৩৪ খ্রিস্টাব্দে শ্রীঅদ্বৈত আচার্য আবির্ভূত হন। পিতা কুবের তর্কপঞ্চানন ছিলেন লাউড়ের রাজা দিব্যসিংহের সভাপ-িত। অদ্বৈত আচার্যের মাতার নাম নাভা দেবী। মাঘী শুক্লাসপ্তমীর পূণ্যতিথিতে এক সুলক্ষণযুক্ত পুত্র ভূমিষ্ট হলো। নবজাত পুত্রের নাম রাখা হয় কমলাক্ষ।
বাল্যকাল হতেই কমলাক্ষের জীবনে দেখা যায় এক অপূর্ব ভক্তিপরায়ণতা। নিবেদিত বস্তু ছাড়া কোনো কিছুই তাঁকে আহার করানো যায় না। কমলাক্ষের বয়স যখন বারো বছর তখন তাঁর পিতা তাঁকে শান্তিপুরে পাঠিয়ে দিলেন। কয়েক বছরের মধ্যে বেদ-বেদান্ত, স্মৃতি এবং ষড়দর্শনের পাঠ তিনি আয়ত্ত করে ফেললেন। কমলাক্ষের জনক-জননী ইতোমধ্যে শ্রীহট্ট হতে চলে আসেন। তখন হতে পুত্রের সাথে একত্রে শান্তিপুরের গঙ্গাতীরে তাঁরা বাস করতে থাকেন।
এক সময়ে তিনি এক অদ্ভুত স্বপ্ন দর্শন করলেন। শিখিপুচ্ছধারী মুরলীধর গোপবেশী কৃষ্ণ তাঁর ভুবনমোহন ভঙ্গিতে সম্মুখে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। বললেন, “আচার্য, জীবের মঙ্গল সাধনের ব্রত তুমি নিয়েছ, এ বড় আনন্দের কথা। যথাসাধ্য ভক্তিতত্ত্বের প্রচার তুমি করতে থাকো, জীবকে কৃষ্ণ নামে উদ্ধার করো। আর এ সঙ্গে কর, লুপ্ত তীর্থের উদ্ধার সাধন। আর শোনো, তোমায় আমি একটা নিগূঢ় সংবাদ দিচ্ছি। আমার এক দিব্যমূর্তি দ্বাদশ-আদিত্য তীর্থে যমুনার তীরে লুকানো আছে। আমার সে বিগ্রহের নাম হচ্ছে- মদনমোহন। তুমি একে উদ্ধার করে সেবা প্রবর্তন কর।”
এ স্বপ্ন দর্শনের পর আনন্দে আচার্যের আর ঘুম হলো না। সকাল হতে না হতেই গ্রামাঞ্চলে গিয়ে সবাইকে ডাকাডাকি শুরু করল। অদ্ভুত স্বপ্ন বৃত্তান্তের কথা শুনে লোকজন জুটতে দেরি হলো না। কোদাল, শাবল নিয়ে গ্রামবাসীরা দলে দলে আসতে লাগল। খননের পর সত্যিসত্যি সেখানকার ভূগর্ভ হতে আবিষ্কৃত হয় এক পরম মনোহর কৃষ্ণমূর্তি। ললিত ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। স্বপ্নাদিষ্ট শ্রীমূর্তি হাতে পেয়ে আচার্য আনন্দে বিহ্বল হন। অতঃপর এক ভক্তিমান সদাচারী ব্রাহ্মণের ওপর বিগ্রহের সেবার ভার দিয়ে তিনি শ্রীধাম বৃন্দাবনের উদ্দেশ্যে রওনা হন। দলে দলে ভক্তবৃন্দ এ বিগ্রহ দর্শনে আসতে থাকে। একদল দুষ্ট স্বভাব পাঠানের দৃষ্টি এদিকে পড়ে। বিগ্রহ নিয়ে এত লোক তাদের ভাল লাগেনি। একদিন তারা দল বেঁধে এ বিগ্রহ অধিকার করতে আসে। বিগ্রহের মর্যাদা হানি ও ভেঙ্গে ফেলার জন্য তারা বদ্ধ পরিকর।
প্রভু মদনমোহন এক অলৌকিক লীলা প্রকটিত করেন। পাঠানেরা মন্দিরে ঢুকে দেখে বিগ্রহ নেই। তারা হতাশ হয়ে স্থান ত্যাগ করে। পূজারী এ সময়ে যমুনার তটে দাঁড়িয়ে স্নান তর্পণ করছিলেন। হামলার কথা শুনে তিনি শীঘ্র ফিরে আসেন। দেখেন বেদীর উপরে বিগ্রহ নেই। ধারণা করেন পাঠানেরা শ্রী বিগ্রহ নিয়ে গেছে। তিনি দুঃখে কাঁদতে লাগলেন।
সংবাদ শুনে অদ্বৈত আচার্য ছুটে আসলেন। তিনি কাঁদতে লাগলেন। অনেক খোঁজাখুঁজি করলেন, কিন্তু হারানো বিগ্রহের কোন সন্ধান পাওয়া গেল না। রাত্রে নিকটস্থ বটবৃক্ষ মূলে আচার্য ঘুমিয়েছেন। স্বপ্নযোগে আবার মিলল শ্রীনন্দনন্দনের সাক্ষাৎ। মধুর কণ্ঠে প্রভু তাঁকে বললেন, “ওহে আচার্য, কেন শুধু তুমি খেদ করছো আর এমন করে ভেবে মরছো? আমায় তো পাঠানেরা ভেঙ্গে ফেলেনি, অপসারিতও করেনি। আমি যে নিজেই আগে থেকে সেই দুষ্ট ব্রজ গোপাল সেজে বেদি থেকে লাফিয়ে পড়েছিলাম। তারপর চুপি চুপি বাইরে এসে, কুটিরের পাশে যে ফুলবাগান আছে, তারই একপাশে লুকিয়ে রয়েছি। ওখান থেকে আমায় তুলে নিয়ে আসো। আর শোনো, এখন থেকে আমার এ দুষ্ট গোপাল লীলার স্মৃতিই এখানে জাগরুক থাক, আর আমার এ বিগ্রহের মদনমোহন নামটা বদলে নাম দাও মদন গোপাল।”
আনন্দে অধীর হয়ে কমলাক্ষ তখন ছুটে যান। কিছুটা অনুসন্ধানের পর শ্রীবিগ্রহ আবিষ্কৃত হয়। অতঃপর মদনগোপাল রূপে তাঁর সেবাপূজা অনুষ্ঠিত হতে থাকে। মাধবেন্দ্রপুরী মহারাজ একবার তীর্থ পরিক্রমার পথে শান্তিপুরে এসে উপস্থিত হন। গুরুদেবের চরণ দর্শন ও সেবার সুযোগ পেয়ে কমলাক্ষের আর আনন্দের অবধি রইল না।
হরিদাস আচার্য প্রভুর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভক্ত। অদ্বৈতের কাছে হরিদাসের বৈষ্ণবীয় শিক্ষা ও সাধন সমাপ্ত হয়েছে। তিনি তাই শান্তিপুর ত্যাগ করবেন বলে মনে করলেন। আচার্য তাকে বিদায় আলিঙ্গন করে বললেন, হরিদাস, তুমি নামমন্ত্রের মহাচারণ। এ নাম প্রচারের ব্রতই তুমি একান্তভাবে গ্রহণ কর। গুরুদেব মাধবেন্দ্রপুরী মহারাজ এ নির্দেশই আমায় দিয়েছিলেন। তোমার জন্য আমি আজ এ ব্রত নির্দিষ্ট করেছি। তখন হতে তাঁর নিত্যকার ব্রতসাধন হল তিন লক্ষ নাম জপ। অদ্বৈত আচার্যের অলৌকিক শক্তির প্রকাশরূপে দেখা দিলেন নামব্রহ্মের আচার্য যবন হরিদাস। আচার্য তাঁর নাম দিলেন- ব্রহ্ম হরিদাস। অদ্বৈত সিংহের হুঙ্কার আর ভক্তশ্রেষ্ঠ হরিদাসের গোফায় বসে নামকীর্তন ও আর্তির ফলে অচিরেই ফলল। ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দের দোলপূর্ণিমা তিথিতে শ্রীন্মমহাপ্রভু ধরাধামে অবতীর্ণ হলেন। জগন্নাথ মিশ্রের পুত্র ধীরে ধীরে বেড়ে উঠলেন।

শ্রীঅদ্বৈতাচার্য কর্তৃক পণতীর্থের উৎপত্তি

শ্রীমতী নাভাদেবীর একবার গঙ্গা স্নানের বাসনা হয়। তিনি শেষরাতে স্বপ্নে দেখেন- তাঁর কোলের শিশুটি চতুর্ভূজ জ্যোতির্ময় সর্বমঙ্গলময় স্বয়ং মহাবিষ্ণু। এরূপ দিব্য দর্শনে শ্রীমতী নাভাদেবী তাঁর স্তবস্তুতি করেন। ঐশ্বর্য ভাবান্বিতা মাতৃদেবীকে তিনি সান্ত¦না প্রদান করে সমস্ত তীর্থ এনে তাতে তাঁকে স্নান করাবার কথা বলেন। শ্রীমতি নাভাদেবী নিদ্রাভঙ্গে স্বপ্নের বিষয় স্মরণ করে চিন্তামগ্ন হন। তিনি স্বপ্নের বিষয় প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে পুত্রের অনুরোধে তা প্রকাশ করে রোদন করতে থাকেন। আমি ‘পণ’ অর্থাৎ প্রতিজ্ঞা করে বলছি- তোমার ইচ্ছে পূরণের জন্য আমি আজ রাতে সকল তীর্থকে আনয়ন করব, তাতে তুমি স্নান করবে। অদ্বৈত প্রভু রাতেই যোগাবলম্বন পূর্বক তীর্থগণকে আকর্ষণ করলে, সমস্ত তীর্থ শ্রীঅদ্বৈত প্রভুর কাছে উপস্থিত হয়ে তাদের আহ্বানের কারণ জিজ্ঞেস করেন। শ্রীঅদ্বৈত প্রভু বলেন- মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশীতে (মহাবারুণি) তোমরা সকলে এখানে পর্বতের উপর বিহার করবে- সকলে আমার কাছে এই ‘পণ’ করো। গঙ্গা-যমুনাদি সকল তীর্থই শ্রীঅদ্বৈতাচার্য প্রভুর আজ্ঞা স্বীকার করে পর্বতে বিহার করতে থাকেন।
শ্রীঅদ্বৈতচন্দ্র প্রভাতকালে জননী নাভাদেবীকে বলেন- মা! পর্বতোপরি সমস্ত তীর্থ এসেছে, তুমি সেখানে গিয়ে স্নান করো। শ্রীমতী নাভাদেবী কৌতূহলবশত পুত্রসহ সেখানে যান। শ্রীঅদ্বৈতচন্দ্র জননী নাভাদেবীর পাশে দাঁড়িয়ে শঙ্খ-ঘণ্টা বাজিয়ে উচ্চৈঃস্বরে হরিধ্বনি করতে থাকেন। হরিধ্বনি করা মাত্র অঝোরে জলের প্রবাহ হতে থাকে।
শ্রীঅদ্বৈতচন্দ্র তখন বলেন- দেখ মা তীর্থের জল পড়ছে। এখানে সকল তীর্থ অবস্থান করছে। ঐ দেখ মা, মেঘের মতো যমুনার জল তোমাকে ভিজিয়ে ফেলেছে, গঙ্গার পুণ্যসলিলবিন্দু তোমাকে সিক্ত করছে। এভাবে অন্যান্য সকল তীর্থের পুণ্য সলিলরাশি পতিত হতে থাকে। অতি আশ্চর্য এ দৃশ্য দর্শন করে এবং পুত্রের বাক্য শ্রবণে শ্রীমতী নাভাদেবীর বিশ্বাস হয় যে, সত্য সত্যই এখানে তীর্থ সকল এসেছেন। তিনি অত্যন্ত ভক্তিভরে তীর্থসমূহকে প্রণাম করে সেই জলে স্নান করলেন। সেই থেকে এ স্থান ‘পণতীর্থ’ নামে খ্যাত হয়। শ্রীঅদ্বৈত প্রভু কর্তৃক স্বীয় জননী নাভাদেবীর অভিলাষ পূর্ণ করার জন্য এবং তীর্থগণের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশীতে (মহাবারুণি) এখানে আবির্ভূত হওয়ার জন্য ‘পণ’করার কারণেই পণতীর্থ নামে প্রসিদ্ধ। মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশীতে এখানে মেলা বসে। ঐ পুণ্য দিনে অদ্যাপি লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রীর সমাগম হয়।
বর্তমানে সেখানে কোনো প্রাচীন স্মৃতি নেই। যাদুকাটা নদীর পূর্বপাড়ে স্থানীয় ভক্ত দ্বারা নির্মিত শ্রীঅদ্বৈত মন্দির রয়েছে। আর পশ্চিম পাড়ে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইস্কন) কর্তৃক শ্রীশ্রীরাধামদনগোপালের সুবৃহৎ মন্দির নির্মিত হয়েছে। মন্দিরে শ্রীশ্রীরাধামদনগোপাল, শ্রীশ্রী জগন্নাথ বলদেব সুভদ্রা ও শ্রীল অদ্বৈত আচার্যের বিগ্রহ স্থাপিত হয়েছে। শ্রীঅদ্বৈত আচার্যের আবির্ভাব তিথিতেও এখানে বিশাল মহোৎসব হয়।
“জয় জয় অদ্বৈতাচার্য দয়াময়।
যার হুঙ্কারে গৌর অবতার হয় ॥"
পণতীর্থ ধামে স্নান মহোৎসব
চৈত্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিকে বারুণী যোগ বলা হয়। যদি ত্রয়োদশী তিথির সঙ্গে শতভিষা নক্ষত্র যোগ হয়, তবে সেটাকে মহাবারুণী যোগ বলা হয়। আর মহাবারুণী যোগ শনিবারে পড়লে, সেটাকে মহা-মহা-বারুণী যোগ বলা হয়।

কীভাবে যাবেন
সুনামগঞ্জ নতুন বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন সুরমা ব্রীজ হতে মোটরসাইকেল, সিএনজি, লেগুণা, মাইক্রোবাসে বিন্নাকুলি বাজার এসে নদীর অপর পাড়ে ইস্কন মন্দিরে আসা যাবে।

*** বর্তমানে পণতীর্থ ধামে ইসকনের একটি সুবিশাল মন্দির অবস্থিত। অত্র মন্দিরে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। উক্ত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে ও মহা মহা বারুণী স্নানযাত্রায় আপনাদের সহযোগিতা কামনা করছি।

ইস্কন এ্যাকাউন্ট: ২১৮৯,
কৃষি ব্যাংক, বাদাঘাট শাখা, তাহিরপুর, সুনামগঞ্জ।
প্রয়োজনে:০১৭১৪-৫২৮৭৪৯, ০১৭১৫-৮১৮৪২২

0 Comments