শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা মহোৎসব মহিমা

শ্রীল প্রভুপাদ একবার বলেছিলেন, আমরা ভগবানের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য যতটা উৎসুক, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার থেকে সহস্রগুণ বেশি উৎসুক যে, তাঁর পথভ্রষ্ট সন্তানেরা কবে জড়বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে তাঁর নিকট আগমন করবে। আর সেজন্যই আমরা ভগবানকে ভুলে গেলেও তিনি আমাদের মঙ্গলের কথা ভোলেন নি বরং আমাদের সার্বিক কল্যাণের জন্য তিনি নানা কল্যাণপ্রদ পন্থা প্রদান করেছেন। বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠান, ধর্মাচরণ প্রভৃতি পালনের দ্বারা যাতে আমরা ভগবানের সেবা মনোভাব লাভ করে তাঁর নিকট ফিরে যেতে পারি সেটিই হচ্ছে সেগুলো প্রণয়ণের একমাত্র উদ্দেশ্য। শুধু তাই নয়, যাতে আমরা এ দুঃখপূর্ণ জগৎ থেকে মুক্তি লাভ করতে পারি, তাই তিনি অবতার এবং তাঁর পার্ষদদের এখানে প্রেরণ করেন, এমনকি নিজেও এখানে অবতীর্ণ হন।
snan yatra 2018
জ্যৈষ্ঠী পূর্ণিমা তিথিতে জগৎজীবের কল্যাণের জন্য পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জগতের নাথ জগন্নাথরূপে প্রকাশিত হন। ভগবান কেবল প্রকাশিত হয়েই কৃপা করেন নি, এমনকি তার আবির্ভাব দিবসটিকেও মহিমান্বিত করার মাধ্যমেও কৃপা প্রকাশ করেছেন। এদিন অনুষ্ঠিত হয় স্নানযাত্রা মহোৎসব। শাস্ত্রে স্নানযাত্রা উৎসবে শ্রীজগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রা মহারাণীকে স্নান করানোর অপার সৌভাগ্য এবং মহিমার কথা বর্ণিত হয়েছে। এমনকি স্নান করাতে অসমর্থ হলেও স্নানযাত্রা দর্শনেরই রয়েছে অপরিসীম মহিমা। স্কন্দপুরাণে পুরুষোত্তম ক্ষেত্র মাহাত্ম্যে (৩১.৭৬) উক্ত হয়েছে,

নাতঃ পরতরং কর্ম হ্যানায়াসেন মোচনম্।
জ্যৈষ্ঠজন্মদিনে স্নানং হর্রেযদবলোকিতম্ ॥
জ্যৈষ্ঠী পূর্ণিমায় শ্রীহরির স্নানযাত্রা দর্শনের মাধ্যমে অনায়াসেই জীব মুক্তিলাভ করতে পারে। এমনকি কেউ যদি ভক্তিসহকারে একবারও স্নানযাত্রা মহোৎসব দর্শন করেন, তাঁর সংসারবন্ধন থেকে মুক্তিলাভ সুনিশ্চিত হয়ে যায়। তার আর শোক করতে হয় না।

জৈমিনি মুনি স্নানযাত্রার মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন ভগবান পুরুষোত্তমের স্নানযাত্রা দর্শন করলে জীব তীর্থসমূহে স্নান করার থেকেও শতগুণ অধিক ফল প্রাপ্ত হয় এবং এতে কোনও সংশয় নেই। (স্কন্দপুরাণ ৩১.৮২) জৈমিনি ঋষি আরও বর্ণনা করেছেন, যদি কেউ আন্তরিকতার সাথে স্নানকালে ভগবানকে নিরীক্ষণ করে, তাদেরকে আর মাতৃগর্ভে বাস করতে হয় না। উৎসুকতাপূর্ণ হৃদয়ে স্নানযাত্রা দর্শন করলে জীবগণ ভবসাগর থেকে উদ্ধার লাভ করতে পারে।
jagannath-2018
পরমানন্দ সহকারে স্নানযাত্রা দর্শন করলে মানুষ আজন্ম যা পাপ করেছে তা বিনষ্ট হয়ে যায়। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণই নীলাচলধামে শ্রীজগন্নাথ, শ্রীবলদেব এবং শ্রীমতী সুভদ্রারূপে বিরাজমান। তাঁদের মধ্যে কোনও ভেদ নেই। ভক্তিসহকারে তাঁদের মহাস্নানযাত্রা দর্শন করলে জীব ইহজগতে যাবতীয় সখলাভ এবং পরিনামে ভগবৎধাম প্রাপ্ত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে।
স্নানযাত্রা মহোৎসব দর্শনকালে ভক্তদের চিত্ত আনন্দপূর্ণ হওয়া উচিত। পুরুষোত্তম মাহাত্ম্যে বর্ণিত হয়েছে যখন স্নানযাত্রা দর্শন করে কেউ আনন্দ সহকারে একবারও “হে কৃষ্ণ! হে জগন্নাথ! হে নাথ! হে রাম! হে সুভদ্রা মহারাণী! আপনাদের জয় হউক!” বলে বা অনুরূপভাবে জয়ধ্বনি করেন, সে নিঃসন্দেহে পরমাগতি লাভ করে। (৩১.৮৬) যারা সেখানে গমন করেন, তারাও জীবন্মুক্ত। তাই তাদের সকলকে সম্মান প্রদর্শন করা কর্তব্য।
স্নানাবশিষ্ট জল মাহাত্ম্য : ভগবানের স্নান-অভিষেকের পর অবশিষ্ট জলও অতিশয় মহিমান্বিত। ভক্তি এবং পূর্ণবিশ্বাসের সাথে কেউ সেই জলে স্নান করলে পরমগতি লাভ করে। তা দীর্ঘায়ু প্রদান করে এবং গঙ্গাদি সমস্ত জলে স্নানের ফল প্রদান করে।

নাতঃ পবিত্রং ভোবিপ্রাঃ স্বর্ধুন্যন্যেহপি কীর্তিতম্ ॥
এমনকি স্বর্গলোকে যে গঙ্গা প্রবাহিত হন, ভগবানের স্নান-অবশিষ্ট জলের তুলনায় সেটিও বিশেষ পবিত্র নয়। ভগবৎ-স্নান-অবশিষ্ট জল তার থেকেও অধিক গুণে পবিত্র। (৩১.৯৬)

যাই হোক পরিশেষে আমাদের শ্রীভগবানের প্রতি কৃতজ্ঞতাপূর্ণ চিত্তে, ভক্তিসহকারে তাঁর সেবায় সংযুক্ত হওয়া উচিত, কেননা এসমস্ত সেবা করবার সুযোগ কৃষ্ণ আমাদের মঙ্গলের জন্যই দিয়েছেন- যাতে আমদের ভববন্ধন মোচন হয় এবং আমরা যৎ গত্বা ন নিবর্তন্তে- যেখানে গেলে আর এই দুঃখময় জড়জগতে ফিরে আসতে হয়না, সেই সৎ-চিৎ-আনন্দময় ভগবৎধামে প্রবেশ করতে পারি।
হরেকৃষ্ণ
মাধুর্য দাস

0 Comments