-->

ভগবান কি আমাদের পরিকল্পনা শুনে হাসেন?

hksamacar
আমরা কল্পনা করি আমাদের জীবন খুব নির্ঝঞ্ঝাটভাবে সুখের দিকে বহমান হবে আর স্বপ্নগুলির সাথে তাল মিলিয়ে চলবে। কিন্তু জীবন যখনই আমাদের মনের মতো পথে চলতে থাকে, তখনই আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরের কিছু একটা সব কিছু ভেঙে চুরমার করে দেয়। আমরা যদি এসব অনিয়ন্ত্রিত ঘটনাগুলো ভগবানের ওপর চাপিয়ে দিই তবে এটাই বলা যায় যে, আমরা যা-ই পরিকল্পনা করি না কেন ঈশ্বর সব ভেঙে দেয়। আর উপরের উক্তিটি এই ঘটনার সাপেক্ষে তৈরি একটি প্রবাদকেই সমর্থন করে, “মানুষ পরিকল্পনা করে আর ঈশ্বর সব ভেস্তে দেন।”
বিখ্যাত মার্কিন সাহিত্যিক এবং নাট্যকার উডি এলেন তার একটি বইয়ে বলেছেন,
hksamacar
যদি আপনি ঈশ্বরকে খুব হাসাতে চান, তাহলে তাঁকে কেবল আপনার পরিকল্পনাগুলো বলুন।
কিন্তু আসলেই কি ভগবান আমাদের পরিকল্পনা শুনে হাসেন? তিনি কি এমন একজন ব্যক্তি যিনি অন্যের সুখ দেখতে পারেন না বলে আমাদের সব পরিকল্পনা ভেস্তে দেন? অবশ্যই না। বাস্তবে ঈশ্বরের হাসার বিষয়টি খুব সূক্ষ্ম এবং এখানে যেমনটা বোঝাচ্ছে তেমন নয়। এই বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদের আগে বুঝতে হবে যে আমাদের ক্ষমতা খুবই অল্প- আর তাই ক্ষমতার বাইরে কোনো কিছু করতে গেলে আমাদের ক্রিয়াগুলো হাস্যকর হয়ে যায়। যেমন ধরুন, একটি বালিকা যদি তার পিতামাতাকে বলে যে সমুদ্রতীরে তার তৈরি একটি বিশাল বালির প্রাসাদে স্বপ্নের রাজকুমার একটি উজ্জ্বল বর্ম পরে সাদা ঘোড়ায় চড়ে আসবে আর তার সাথে বাস করবে। তখন পিতামাতা হাসেন কিন্তু তা ঐ বাচ্চাটিকে দুঃখী করবার জন্য নয়; বরং কেবল বাচ্চা মেয়েটির বালির প্রাসাদ নিয়ে এরকম বৃহৎ চিন্তা দেখে। অনুরূপভাবে যখন আমরা সময়ের প্রভাবে যে জড়জগতে সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে সেখানে আমাদের উত্তম উত্তম পরিকল্পনাগুলি কাজে লাগাই, তবে সেটিও ঐ বাচ্চা মেয়ের বালির প্রাসাদ নিয়ে চিন্তার শামিল। আর তাই ঈশ্বর আমাদের এরকম শিশুদের ন্যায় পরিকল্পনা দেখে হাসেন, কিন্তু তিনি আমাদের দুঃখী করতে চান না। আমাদের এ বিভ্রম দূর করার উপায় হচ্ছে, ‘আমরাই জগতের নিয়ন্তা এবং পরিবর্তনকারী’ - আমাদের এরকম আজেবাজে চিন্তাগুলো বদলানো। যাই হোক, এরকম বিভ্রমাত্মক চিন্তা দূর করা উচিত আমাদের হতাশ করবার জন্য নয় বরং আমরা যে প্রকৃত অর্থে অসহায় সেটি বোঝার জন্য। আমরা পরমেশ্বরের অবিচ্ছেদ্য অংশ আর তিনি হচ্ছেন পরম নিয়ন্তা। তাঁর অংশ হিসেবে আমরাও আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জিনিসের নিয়ন্তা। বস্তুত আমাদের যতটুকু অধিকার আছে ততটুকুর মধ্যেই আমাদের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা। আর তা হচ্ছে ভগবানের সেবা সম্পাদন করার জন্য।
ভগবানের প্রতি নিবেদিতচিত্ত ভক্তরাও বিভিন্ন পরিকল্পনা করেন। কিন্তু তারা সেই পরিকল্পনা অনুসারে কাজ করেন নিরাসক্তভাবে। যদি কখনও তাদের কোনো পরিকল্পনা অসফল হয় তখন হয়তো তারা সাময়িকভাবে হতাশাচ্ছন্ন হন। কিন্তু তারা কখনোই তাদের হৃদয় ভেঙে ফেলেন না বা সবকিছুকে মূল্যহীন বলে মনে করেন না। তারা সর্বদাই তাদের পরিকল্পনার পরম উদ্দেশ্য হিসেবে ভগবানের সেবাটিকেই রাখেন। তারা ভগবানকে সন্তুষ্ট করবার জন্য, তাঁর আরো নিকটবর্তী হওয়ার জন্য আরেকটি নতুন পন্থা খুঁজে বের করেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আমরা এ জড়জগতে প্রতিষ্ঠিত হবার চেয়ে বৃহত্তর কিছু করার জন্য সৃষ্ট হয়েছি। যেমন একটি শিশুকে বড় হতে হয় এবং আরো গঠনমূলক ক্রিয়াতে সংযুক্ত হতে হয় তেমনি আমাদেরও পারমার্থিকভাবে উন্নত হতে হবে এবং আরও গঠনমূলকভাবে সেবায় সংযুক্ত হতে হবে। তবে একটি শিশুকে যেমন বালির প্রাসাদ বানানো বন্ধ করা দরকার, তেমন করে জড়জগতে থাকা অবস্থায় আমাদের প্রচেষ্টা বন্ধ করার দরকার নেই, বরং আমাদের চেতনা ও আবেগকে ভগবানের অপ্রাকৃত সেবায় সংযুক্ত করা উচিত। এভাবে যখন আমরা আমাদের চেতনাকে ভগবৎসেবায় বিনিয়োগ করব, তখন এ জগৎটিকে আমাদের ভাব ও মেধানুসারে ভগবৎসেবার একটি ক্রিয়াক্ষেত্র হিসেবে দেখতে পাব। আর এটিই ভগবানের সেবার প্রকৃত উপায় যা তাঁকে খুব আনন্দিত করতে পারে।
নিঃসন্দেহে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার উদ্দেশ্য ছিল অর্জুনকে শ্রীকৃষ্ণের পরিকল্পনার সাথে সমন্বিত হতে উৎসাহিত করা এবং ধর্ম-সংস্থাপনের জন্য সংঘটিত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সংযুক্ত করা (গীতা ১৮/৭৩)। অর্জুন সর্বদা বিভিন্ন পরিকল্পনা করেছিলেন যাতে তিনি বিপক্ষের সেনাপতিদের মোকাবিলা করতে পারেন। আর শ্রীকৃষ্ণ তাঁর দিক নির্দেশ করেছিলেন। অর্জুনের অধ্যবসায় ছিল সেবার প্রতি- সঠিকভাবে সম্পাদন ও তা পরিপূর্ণ করা এবং শ্রীকৃষ্ণকে সন্তুষ্ট করা।
ঠিক যেভাবে পিতামাতার ইতোমধ্যে একটি বাড়ি আছে যেখানে সন্তান অনায়াসে সুখে বাস করতে পারে, তেমনি ভগবানের একটি ব্যক্তিগত নিবাস আছে যেখানে আমরা নিশ্চিন্তে পরমানন্দে তাঁর সাথে বাস করতে পারি। আমরা যখন পারমার্থিকভাবে উন্নত হয়ে উঠি আর আমাদের জীবনের উদ্যমগুলো পরমেশ্বরের সেবায় এবং নিজেদের শুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ব্যয় করি, তখন আমরা এ জগতে কোনোরূপ আকর্ষণ ছাড়াই সঠিকভাবে কাজ করতে পারি।
যখন আমরা পরমেশ্বর ভগবানের সেবা করার উদ্দেশ্যে জীবনযাপন করি এবং তাঁকেই আমাদের জীবনের চরম উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করি তখন আমরা আমাদের জীবনের শেষে এ জড়দেহটি ত্যাগ করে তাঁর পরমধামে তাঁর সঙ্গে নিবাস করতে পারি। আর তখন আমাদের ন্যায় উড়নচণ্ডী সন্তানদের পুনরায় তাঁর কাছে ফিরে আসতে দেখে ভগবান পরমানন্দে হাসেন।
চৈতন্যচরণ দাস

0 মন্তব্য