-->

শ্রীল প্রভুপাদের অনবদ্য জীবনকথা

hksamacar-pic হরেকৃষ্ণ সমাচার ডেস্ক:
 ১৮৯৬
কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ (পূর্বনাম- অভয়চরণ দে) ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দের ১ সেপ্টেম্বর কলকাতার টালিগঞ্জে আদিগঙ্গাতীরে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শ্রী গৌরমোহন দে ছিলেন একজন বস্ত্র ব্যবসায়ী এবং মাতা শ্রীমতি রজনী দেবী।
 ১৯২২
বন্ধু নরেন্দ্রনাথ মল্লিকের সাথে কলকাতা উল্টাডাঙ্গায় শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী প্রভুপাদের সাক্ষাৎ লাভ করেন। তিনি এই বুদ্ধিদীপ্ত, তেজস্বী ও শিক্ষিত যুবকটিকে বৈদিক জ্ঞান প্রচারের কাজে জীবন উৎসর্গ করতে উদ্বুদ্ধ করেন। কিন্তু অভয়ের প্রশ্ন, “ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আপনার চৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী কে শুনবে?” শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর বলেছিলেন, “কৃষ্ণভাবনামৃত ভারতীয় রাজনীতির পরিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করে থাকতে পারে না। মানুষের সৃষ্ট কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা মানবতার উপযুক্ত হতে পারে না। ব্যক্তিগত, সামাজিক অথবা রাজনৈতিক কল্যাণ তখনই সাধিত হয়, যখন পরমেশ্বর ভগবানের সাথে জীবের নিত্য সম্পর্কের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে সাহায্য করে জীবকে পারমার্থিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।” 
 ১৯৩৩
এলাহাবাদে শ্রীমৎ ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর প্রভুপাদের কাছ থেকে দীক্ষাগ্রহণ করেন।  ১৯৩৫
শ্রীরাধাকুণ্ডে গুরুমহারাজের কাছ থেকে পাশ্চাত্য দেশে প্রচার, বিশেষ করে গ্রন্থ প্রচার-সংক্রান্ত নির্দেশ প্রাপ্ত হন। “যদি কখনও টাকা পাও, গ্রন্থ ছাপিও।” ফেব্রুয়ারি ২৫ তারিখ গুরু মহারাজের ব্যাসপূজা উপলক্ষে সম্মেলনে ইংরেজিতে একটি কবিতা ও একটি প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন। পরমব্রহ্ম পরমপুরুষ প্রমাণ করিলে তুমি। নির্বিশেষ নির্বাণবাদ ত্যজিল ভারতভূমি ॥ তাঁর লেখা পড়ে মুগ্ধ হয়ে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর গৌড়ীয় মঠের মুখপত্র ‘দ্য হারমোনিস্ট’ - এর সম্পাদককে বলেছিলেন- “ও যা লেখে, তাই ছাপিও।”
 ১৯৩৬
ডিসেম্বর মাসের ৩১ তারিখ শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর অপ্রকটের এক মাস পূর্বে অভয়চরণকে একটি পত্র লেখেন, “আমি স্থির নিশ্চিত যে যারা বাংলা ও হিন্দি ভাষা জানেন না, সেই সব মানুষের কাছে তুমি ইংরেজিতে আমাদের চিন্তা ও যুক্তি ব্যাখ্যা করতে পারবে। আশা করছি তুমি নিজেকে একজন সুদক্ষ ধর্মপ্রচারকে পরিণত করবে।”
 ১৯৪৪
দিল্লিতে তিনি ‘ব্যাক টু গডহেড’ নামক ইংরেজি ম্যাগাজিন ছাপাতে আরম্ভ করেন। নিজের হাতেই সেটি প্রচার করতেন।
 ১৯৪৭
‘গীতোপনিষদের সূচনা’ নামক গ্রন্থ রচনার দরুন শ্রীল প্রভুপাদের দার্শনিক জ্ঞান ও ভক্তির উৎকর্ষতার স্বীকৃতিরূপে ‘গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ’ তাঁকে ‘ভক্তিবেদান্ত’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
 ১৯৫০
তিনি ৫৪ বছর বয়সে সংসার জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করে বানপ্রস্থ আশ্রম অবলম্বন করেন এবং শাস্ত্র অধ্যয়ন, প্রচার ও গ্রন্থ রচনার কাজে মনোনিবেশ করেন।
 ১৯৫৩
তিনি ঝাঁসিতে ‘লীগ অব ডিভোটিস’ প্রতিষ্ঠিত করেন।
 ১৯৫৯
শ্রীল প্রভুপাদ বৃন্দাবনে শ্রীশ্রীরাধা দামোদর মন্দিরে থাকতে শুরু করেন এবং একই সাথে ‘শ্রীমদ্ভাগবত’- অনুবাদ শুরু করেন। সেপ্টেম্বর ১৫ তারিখ বিশ্বরূপ মহোৎসবের দিন মথুরার কেশবজী গৌড়ীয় মঠে তদীয় জ্যেষ্ঠ গুরুভ্রাতা শ্রীল ভক্তিপ্রজ্ঞান কেশব মহারাজের কাছ থেকে সন্ন্যাস দীক্ষা প্রাপ্ত হন।
 ১৯৬২
ক্রমে ক্রমে চাঁদা ও দান সংগ্রহ করে নিজের খরচেই শ্রীমদ্ভাগবতের ১ম স্কন্ধের ১ম খ-টি প্রকাশ করেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণানকে একটি কপি পাঠান। পরে প্রধানমন্ত্রী শ্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী মহাশয়কেও একটি কপি প্রদান করেন।
 ১৯৬৫
আগস্ট মাসের ১৩ তারিখে সিন্ধিয়া জাহাজ কোম্পানির মালবাহী জাহাজ ‘জলদূত’-এ করে কলকাতার খিদিরপুর ডক থেকে যাত্রা করেন। যাবার আগে তিনি শ্রীধাম মায়াপুরে গুরু মহারাজের সমাধি দর্শনে যান। আমেরিকা যাবার পথে তিনি তাঁর গ্রন্থগুলো ছাড়া সাথে নিয়েছিলেন একটি স্যুটকেশ, ছাতা ও চিড়ে-মুড়ি। জলযাত্রায় দু’বার হার্ট অ্যাটাক হয়। কৃষ্ণের কৃপায় কোনোমতে তিনি বেঁচে যান। অবশেষে তিনি সেপ্টেম্বর মাসের ১৭ তারিখ বোস্টনে পদার্পণ করেন। জাহাজে বসে থেকে তিনি ‘মার্কিনে ভাগবৎ ধর্ম’ শীর্ষক একটি কবিতা লেখেন। ১৯ তারিখ সেটি নিউইয়র্কের ব্রুকলিন বন্দরে পৌঁছায়। ২২ সেপ্টেম্বর তাঁকে নিয়ে ‘Butler Eagle’ পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ বের হয়। যাতে তাঁকে ‘বৈকুণ্ঠ দূত’ বলে অভিহিত করা হয়।
 ১৯৬৬
প্রায় ১ বছর প্রচারের ফলস্বরূপ জুলাই মাসের ১৩ তারিখে শ্রীল প্রভুপাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে শ্রীল প্রভুপাদ International Society for Krishna consciousness (ISKCON) আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইস্কন) প্রতিষ্ঠা করেন। নিউইয়র্কের ২৬ সেকেন্ড এভিনিউ হয় সেটির নিবন্ধিত ঠিকানা। সেপ্টেম্বরের ৮ তারিখ জন্মাষ্টমীর পরের দিন তিনি পাশ্চাত্যে প্রথম দীক্ষা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন এবং এগার জনকে প্রাথমিক ভাবে দীক্ষা প্রদান করেন। তারা নিয়মিত হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ ও চারটি নিয়ম পালন করত।
 ১৯৬৭
শ্রীল প্রভুপাদ সর্বপ্রথম আমেরিকার সানফ্রান্সিসকোতে শ্রীজগন্নাথদেবকে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং কিছুদিন পরই রথযাত্রা উৎসবের সূচনা করেন। সেদিন হাজারো আমেরিকান স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে শ্রীজগন্নাথদেবের কৃপা ও আশীর্বাদ গ্রহণ করেন। রথযাত্রা উৎসবের সাফল্য দেখে শ্রীল প্রভুপাদ ও তাঁর শিষ্যবর্গ পৃথিবীর বড় বড় শহরে রথযাত্রা উৎসব করতে অনুপ্রাণিত হন।
 ১৯৬৮
শ্রীল প্রভুপাদ যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম ভার্জিনিয়ার পার্বত্য ভূমিতে গড়ে তোলেন নব বৃন্দাবন, যা হলো বৈদিক সমাজের প্রতীক। এই সফলতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁর শিষ্যবৃন্দ পরবর্তীকালে ইউরোপ ও আমেরিকায় আরও অনেক পল্লী আশ্রম গড়ে তোলেন। আমেরিকার বিখ্যাত ম্যাকমিলান কোম্পানির মাধ্যমে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সংক্ষিপ্ত সংস্করণ প্রকাশিত হয়।
 ১৯৬৯
শ্রীঈশোপনিষদ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। জুলাই ১৬, লস অ্যাঞ্জেল্সে শ্রীশ্রীরুক্মিনী দ্বারকাধীশ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ডিসেম্বর ১৪, যুক্তরাজ্যের প্রাণকেন্দ্র লন্ডনে শ্রীশ্রীরাধা-লন্ডনেশ্বর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত হয়।
 ১৯৭২
পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার শ্রীধাম মায়াপুরে শ্রীল প্রভুপাদ ইস্কনের মূল কেন্দ্রটি স্থাপন করেন ১৯৭২ সালে। এখানে বৈদিক শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চার জন্য একটি বর্ণাশ্রম মহাবিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনাও তিনি দিয়ে গেছেন। আমেরিকার ডালাসে মাত্র তিনজন ছাত্র নিয়ে গুরুকুল বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শ্রীল প্রভূপাদ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বৈদিক শিক্ষা-ব্যবস্থার প্রচলন করেন।
 ১৯৭৭
১৯৭৭ সালের ১৪ নভেম্বর এই ধরাধাম থেকে অপ্রকট হওয়ার পূর্বে শ্রীল প্রভুপাদ সমগ্র জগতের কাছে ভগবানের বাণী পৌঁছে দেবার জন্য তাঁর বৃদ্ধাবস্থাতেও সমগ্র পৃথিবী চৌদ্দবার পরিক্রমা করেন।

0 মন্তব্য