ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অতি প্রিয় কার্তিক মাস

hksamacar
গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে এবং ভ্যাপসা বর্ষার আমরা শরৎ ঋতুকে অনুভব করতে পারি যা বৎসরের মধ্যে এক অনন্য সুন্দর ঋতু। বৈদিক দিন পঞ্জিকা অনুসারে শরৎ ঋতু সাধারণত আশ্বিন ও কার্তিক মাসে পড়ে যার মধ্যে কার্তিক মাস অধিক মহত্ত্বপূর্ণ।
প্রত্যেকেই বিশেষ কিছু খাদ্য, পানীয়, বস্ত্র এবং সংগীত পছন্দ করেন। ভগবান কৃষ্ণও এর ব্যতিক্রমী নন, বস্তুতপক্ষে আমাদের নিজস্ব পছন্দ আছে, কারণ আমরাও কৃষ্ণের অংশ, যাঁর নিজস্ব ব্যক্তিগত পছন্দও রয়েছে। কৃষ্ণ মাখন, হলুদ বস্ত্র (পীতাম্বর), ময়ুর পালক, গাভী, বংশী এবং বৃন্দাবনের ভূমিকে পছন্দ করেন। অনুরূপভাবে সমস্ত মাসগুলোর মধ্যে তিনি কার্তিক মাসকে সর্বাধিক পছন্দ করেন।
একটি ভালোবাসার মাস
যদিও পারমার্থিক সেবা যেকোনো সময়, যে কোনো স্থানে করা যায়, কিন্তু ভক্তরা অবগত আছেন যে, এ মাসে পারমার্থিক সেবা ভগবানের বিশেষ সন্তুষ্টি যুক্ত। তাই তারা কার্তিক মাসব্যাপী অধিক কটোর পারমার্থিক তপশ্চর্যা করেন। বৈদিক শাস্ত্রে এই কার্তিক মাসে পারমার্থিক সেবার ভৌতিক লাভ সম্বন্ধে বিশদ বর্ণনা করা হয়েছে। যদিও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুদ্ধ ভক্তের নিকট ভৌতিক ফল লাভের জন্য কোনো উৎসাহ নেই। তারা শুধু ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে সন্তুষ্ট করার ব্যাপারে উৎসাহী। ইস্কন ভক্তরা প্রতি বছর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন কার্তিক মাসের আগমনের জন্য যখন তারা প্রত্যহ সন্ধ্যায় শ্রীশ্রীদামোদর অষ্টকম্ কীর্তন করতে পারেন এবং তাদের আন্তরিক প্রেম ভক্তি নিবেদন করতে পারেন। ভগবানের সম্মুখে ঘৃতের প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করেন। সমগ্র মাসব্যাপী তারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বাল্যরূপ দামোদর লীলারসে নিমজ্জিত থাকেন এবং তারা সর্বক্ষণ শ্রবণ কীর্তনে মগ্ন থাকেন।
দামোদর অষ্টকম্ প্রার্থনা সত্যব্রত মুনি কর্তৃক রচিত, যেখানে পরম পুরুষোত্তম ভগবানকে অপূর্বরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। পারমার্থিক সেবার বিজ্ঞানকে যেকোনো ব্যাখ্যা করা হয়েছে- সর্বশক্তিমান, সর্বপরিব্যপ্ত ভগবান কিভাবে অনায়াসেই ভক্তদের প্রেমভক্তির দ্বারা পরাজিত হন এবং সে সমস্ত শুদ্ধ ভক্তরা সর্বদাই ভগবানের লীলাসমূহ শ্রবণ বা কীর্তন ব্যতীত আর অন্য কিছু অভিলাষ করেন না। “হে ভগবান দামোদর, যদিও আপনি সমস্ত প্রকার আশির্বাদ প্রদানে সক্ষম, আমি আপনার নিকট নৈর্ব্যক্তিক মুক্তির বর প্রার্থনা করি না, এমনকি সর্বোচ্চ মুক্তি বৈকুণ্ঠধাম প্রপ্তিরও বা আর অন্য অনুরূপ বরেরও প্রার্থনা করি না। হে প্রভু, আমি শুধু এই প্রার্থনা করি যে, বৃন্দাবনে তোমার বালগোপাল রূপ সর্বদা আমার হৃদয়ে বিরাজ করুক। এছাড়া আমার আর অন্য বরের কিবা প্রয়োজন? হে দেব, তোমার বদন-কমল অতীব শ্যামল, স্নিগ্ধ ও রক্তবর্ণ কেশ সমূহে সমাবৃত এবং তোমার যে বদন-কমলস্থ বিম্বফল সদৃশ রক্তবর্ণ অধর মা যশোদা বারংবার চুম্বন করছেন, সেই বদন-কমলের মধুরিমা আমি আর কি বর্ণনা করব? আমার মনের মধ্যে সেই বদন-কমল আবির্ভূত হোক। ঐশ্বর্যাদি অন্যবিধ লক্ষ লক্ষ লাভেরও আমার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি আর অন্য কিছু চাই না।” (দামোদর অষ্টকম্ ৪-৫)
এই হচ্ছে শুদ্ধভক্তি এবং এক শুদ্ধভক্তের জীবন। এই হচ্ছে কার্তিক মাসের মধুরিমা।
আলোর উৎসব
ভারতবর্ষের সর্বাধিক জনপ্রিয় উৎসব হচ্ছে দীপাবলি যা কার্তিক মাসে পালিত হয়। শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুরের বর্ননা অনুযায়ী ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর দামোদর লীলা এই দীপাবলির দিনেই সম্পাদন করেছিলেন। এ লীলা বিলাস শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্ধে বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক মাখনপাত্র ভেঙে কৃষ্ণ মা যশোদাকে ক্রোধিত করেছিলেন, তখন কৃষ্ণ দৌড়ে পলায়ন করলেন এবং দেখলেন যে, ক্র্দ্ধু যশোদা মা তাঁকে তাড়া করছেন। এক অক্লান্ত প্রচেষ্টার পর মা যশোদা বালক কৃষ্ণকে আবদ্ধ করতে সক্ষম হলেন এবং এক রজ্জু দ্বারা তাঁকে এক উদুখলের সঙ্গে বন্ধনে প্রয়াসী হলেন। কিন্তু বিস্ময়করভাবে তিনি লক্ষ্য করলেন যে, তার ব্যবহৃত রজ্জু দুই আঙ্গুল কম পড়ছে। যদিও তিনি অধিক রজ্জু ব্যবহার করেছিলেন কিন্তু প্রতিবারই ঠিক দুই আঙ্গুলই রজ্জু কম পড়ে, কৃষ্ণকে বন্ধন আর করা যায় না। অবশেষে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর মাতার তাকে বন্ধনের এ কঠোর এবং অসীম প্রয়াসকে স্বীকৃতি প্রদান করে তাঁর বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যান। ভক্তরা তখন তাকে দামোদর বলে সম্বোধন করতে শুরু করেন, ‘যার উদর (পেট) দাম (রজ্জু) দ্বারা বন্ধন করা হয়েছে এমন।’
শ্রীল প্রভুপাদ ব্যাখ্যা করেছেন- যোগীরা কৃষ্ণকে পরমাত্মারূপে ধরতে চায়, এবং কটোর তপস্যার দ্বারা তাকে পাওয়ার চেষ্টা করেও তারা সফল হন না। কিন্তু এখানে আমরা দেখছি যে, মা যশোদা কৃষ্ণকে ধরে ফেলবেন সেই ভয়ে কৃষ্ণ ছুটে পালাচ্ছেন। এটি ভক্ত এবং যোগীর মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করে। যোগীরা কৃষ্ণকে পায় না, কিন্তু মা যশোদার মতো শুদ্ধ ভক্তের কাছে কৃষ্ণ ইতিমধ্যেই ধরা পড়ে গেছেন। এমন কি কৃষ্ণ মা যশোদার হাতের ছড়ির ভয়ে ভীত হয়েছিলেন ... শ্রীকৃষ্ণ মা যশোদার ভয়ে ভীত, আর যোগীরা কৃষ্ণের ভয়ে ভীত। (ভাগবত ১০/৯/৯ তাৎপর্য)
যখন ভক্তরা দেখেন যে, অনন্ত কোটি বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের প্রভু তাঁর ভক্তের প্রেমভক্তির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়েন তখন তাদের হৃদয় কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। কৃষ্ণের বিভু গুণাবলীর দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে তাদের হৃদয় নিয়ন্ত্রনহীনভাবে কৃষ্ণের দিকে ধাবিত হয়। যদিও ভক্তরা চায় না যে, কৃষ্ণ তাদের বশীভূত হোক কিন্তু ভগবান কৃষ্ণ তাঁর ভক্তদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার আনন্দ রস আস্বাদন করেন। প্রত্যেকেই অপরের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়ার প্রয়াস করে কারণ যেথা প্রেম বর্তমান সেথায় সুখের জয়লাভের অধিষ্ঠান অপেক্ষা প্রেমের কাছে পরাভূতি স্বীকার করে। শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীমদ্ভাগবত (৬/১৬/৩৪) শ্লোকের তাৎপর্যে ব্যাখ্যা করেছেন। ভগবান এবং ভক্ত উভয়েরই জয় হয়। ভগবান ভক্তের দ্বারা এবং ভক্ত ভগবানের দ্বারা বিজিত হন। পরস্পরের দ্বারা বিজিত হওয়ার ফলে, তারা উভয়েই তাদের সেই সম্পর্কের মাধ্যমে অপ্রাকৃত আনন্দ আস্বাদন করেন।
কারণ এ সুমধুর লীলা কার্তিক মাসে সম্পাদিত হয়েছিল। তাই কার্তিক মাসকে বলা হয়- দামোদর মাস। সমস্ত মাস ব্যাপী ভগবানের এই মনোরম এবং অনবদ্য লীলা রসে নিমজ্জিত থেকে ভক্তরা ভগবানের অধিক ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য অনুভব করে। আপনি এ নিমজ্জনে প্রয়াস করতে পারেন। যদি সম্ভব হয় তাহলে কোনো ইসকন্ মন্দিরে আসুন এবং সমগ্র কার্তিক মাসব্যাপী সান্ধ্যাকালীন দামোদর অষ্টকম্ প্রার্থনায় যোগদান করুন এবং দীপ সহযোগে আপনি আপনার ভক্তিসেবা ভগবান দামোদরকে নিবদন করুন। যদি আপনি ইসকন্ মন্দির পরিদর্শনে অসমর্থ হন তাহলে অনুগ্রহ করে নিজ গৃহেই এ প্রার্থনা এবং দীপদানে ব্রতী হোন।
কার্তিক এবং ভগবান শ্রীরামচন্দ্র
দীপাবলি সমগ্র ভারতবর্ষ ব্যাপী পালিত হয়। কথিত আছে অসুর রাবণ নিধন করার পর ভগবান শ্রীরামচন্দ্র দীপাবলিতে অযোধ্যায় প্রবেশ করেন। ভগবানের এ আগমন উৎসবকে পালন করার জন্য অযোধ্যাবাসী তাদের রাজ্যকে দীপ দ্বারা আলোকিত করেছিলেন যা কিনা ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের চৌদ্দ বৎসর অনুপস্থিতিতে এক ভুতুড়ে রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। অযোধ্যা আমাদের হৃদয় স্বরূপ এবং সীতা-রাম হচ্ছে আমাদের হৃদয়ের জীবনী শক্তি। একদা অযোধ্যা খুব সমৃদ্ধশালী রাজ্য ছিল, কিন্তু যখন সীতা এবং রামচন্দ্র অযোধ্যা ত্যাগ করেন তখন অযোধ্যাবাসীরা অনুভব করেছিলেন যে, তাদের হৃদয় স্তব্ধ হয়ে গেছে এবং তারা চলমান শবদেহের মতো আচরণ করছেন। তাদের প্রিয় ভগবানের থেকে যখন তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন তাদের সেই সময়ের মানসিক যন্ত্রণা অবর্ণনীয়। তারা তাদের নিত্যকর্ম শুধু নিয়মরক্ষার জন্যই করতেন এ আশায় যে, একদিন তারা আবার তাদের প্রভু রামচন্দ্রের দর্শন পাবেন। ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু স্বয়ং তাঁর বিরহব্যাথার অনুভব শিক্ষাষ্টকমের ষষ্ঠ শ্লোকে বর্ণনা করেছেন, ‘শূন্যায়িতং জগৎ সর্বং গোবিন্দ বিরহেণ মেঃ’- হে গোবিন্দ, তোমার অদর্শনে আমার নিমেষ সমূহ যুগবৎ বোধ হচ্ছে। চক্ষুদ্বয় মেঘের মতো অশ্রুবর্ষণ করছে এবং সমস্ত জগৎ শূন্য প্রায় বোধ হচ্ছে।
যখন ভগবান শ্রীরামচন্দ্র ফিরে আসলেন তখন অযোধ্যাবাসীগণ পুনর্জীবন প্রাপ্ত হলেন এবং তাদের শূন্য হৃদয় পুনরায় আনন্দে ভরে উঠল। হৃদয়ের এই আলোকে প্রজ্জ্বলনই দীপাবলীরূপে প্রকাশ পেয়েছিল।
কার্তিক মাসের অন্যান্য উৎসব
গোবর্ধন পূজাও কার্তিক মাসে সম্পাদিত হয়। যখন কৃষ্ণ নন্দ মহারাজকে পারিবারিক সংস্কৃতির ইন্দ্রপূজা বন্ধ করতে সম্মত করালেন তখন ক্রোধিত ইন্দ্র সমগ্র বৃন্দাবনের ওপর বর্ষণের জন্য প্রবল বৃষ্টি বর্ষণ করেন। কিন্তু বৃন্দাবন যেহেতু শ্রীকৃষ্ণের দ্বারা সুরক্ষিত ছিল, ইন্দ্র বৃন্দাবনের একটি ধূলিকণারও ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম হলেন না। কৃষ্ণ তার বাম হস্তের কনিষ্ঠ অঙ্গুলীর দ্বারা অনায়াসে গোবর্ধন পর্বতকে উত্তোলন করে ইন্দ্রের অহংকার চূর্ণ করেছিলেন। এইরূপে তিনি বৃন্দাবনের ভক্তগণকে রক্ষা করেছিলেন।
এই লীলাও ভগবান কৃষ্ণের তাঁর ভক্তদের প্রতি অসীম করুণার কথা প্রমাণ করে। ভগবদ্গীতায় (১৮/৬৬), কৃষ্ণ আশ্বস্ত করেছেন আমরা যদি সর্বধর্ম ত্যাগ করে শুধু তার নিকট আত্মসমর্পণ করি তাহলে তিনি সর্ব অবস্থায় আমাদের রক্ষা করবেন। গোবর্ধন পর্বত উত্তোলন করে কৃষ্ণ স্থাপন করেছিলেন যে, তার ভক্তদের রক্ষার জন্য তিনি সমস্ত কিছুই করতে পারেন। ভগবানের এই লীলাকে স্মরণ করে ভক্তরা ভগবানের প্রতি পরম কৃতজ্ঞতা অনুভব করে। তারা সর্বস্ব ত্যাগ করে কৃষ্ণের নিকট আত্মসমর্পনে বদ্ধ পরিকর হয়।
অবশেষে, ইস্কন ভক্তদের কাছে কার্তিক মাসের অন্য আরেক মাহাত্ম্যও আছে- ইস্কন প্রতিষ্ঠাতা আচার্য কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তিশ্রীল এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ এই কার্তিক মাসেই জড় জগৎ থেকে অপ্রকট হয়ে চিন্ময় ধামে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিত্যলীলায় প্রবেশ করেন। সমগ্র বিশ্বের মানুষ বিশেষ করে ইসকন ভক্তরা শ্রীল প্রভুপাদের নিকট আধ্যাত্মিক ঋণগ্রস্থ তাকবে কারণ তিনি যদি না থাকতেন তাহলে দামোদর লীলার মাহাত্ম্য আমরা অনুধাবন করতে পারতাম না, অনুধাবন করতে পারতাম না দীপাবলি, অনুধাবন করতে পারতাম না ভগবান এবং তার ভক্তের মধ্যে ধারণাতীত অনুপম সম্পর্ক।

বংশীবিহারী দাস

0 Comments