-->

শ্রীপাদ রামানুজাচার্যের সংক্ষিপ্ত জীবনী

চেন্নাইয়ের শ্রীমহাভুতপুরী নামক গ্রামে বিষ্ণুভক্তি-পরায়ণ শ্রীকেশবাচার্য ও শ্রীকান্তিমতীকে আশ্রয় করে ১০১৭ খ্রিষ্টাব্দের চৈত্র শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে ভগবদিচ্ছায় সঙ্কর্ষণ-শক্তি জগতে অবতীর্ণ হলেন। কান্তিমতীর ভ্রাতা শ্রীশৈলপূর্ণ শ্রীরঙ্গমে বাস করতেন; কান্তিমতীর গৃহে এক পুত্রজন্ম হয়েছে শ্রবণ করে তিনি বালককে দেখতে এলেন এবং শিশুতে শ্রীলক্ষ্মণের সদৃশ লক্ষণসমূহ দেখতে পেয়ে তাকে ‘রামানুজ’ নামে অভিহিত করেন।
ramanujacharya
Ramanujacharya
ছোটবেলা থেকেই রামানুজের সুতীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও অপূর্ব প্রতিভা লক্ষিত হতে লাগল। বাল্যকালেই রামানুজের ভগবদ্ভক্তির প্রতি যথেষ্ট অনুরাগ বিশেষত বৈষ্ণবসঙ্গ ও বৈষ্ণব সেবার অসামান্য আকর্ষণ ছিল। কাঞ্চিপূর্ণ নামে এক পরম ভাগবত কাঞ্চিপুরে ভগবান শ্রীবরদরাজের একনিষ্ঠ সেবক ছিলেন; কাঞ্চিপূর্ণ নীচ শূদ্র কুলে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি প্রতিদিন কেশবের গৃহের পার্শ্ব দিয়ে বরদরাজের সেবা নিমিত্ত যাতায়াত করতেন। বালক রামানুজ কাঞ্চিপূর্ণকে দৃষ্টিমাত্রে পরম বৈষ্ণবজ্ঞানে সেবা করতে উদ্যত হতেন। কিন্তু কাঞ্চিপূর্ণ ব্রাহ্মণতনয় রামানুজের এতাদৃশ ব্যবহার দর্শন করে স্বীয় বৈষ্ণবোচিত দৈন্য প্রকাশপূর্বক বললেন যে, তিনি অত্যন্ত নীচ শূদ্র; সুতরাং ব্রাহ্মণতনয় রামানুজের পক্ষে শূদ্রের সেবা করা অনুচিত। এটা শুনে বালক রামানুজ বললেন, “প্রভু, বৈষ্ণব কখনো শূদ্র নহে, বৈষ্ণবই ব্রাহ্মণের গুরু; দেখুন, ‘তিরু আপ্পান আলোয়ার’ চণ্ডালকুলে আবির্ভূত হয়েও ব্রাহ্মণের পূজনীয় হয়েছিলেন।”
পিতৃদেবের পরলোকগমনের পর রামানুজের শাস্ত্রাধ্যয়নের প্রবল ইচ্ছা হয়; শ্রীকাঞ্চিপুরীতে প্রসিদ্ধ বেদান্ত-শাস্ত্রী যাদবাচার্যের কাছে বেদান্ত পাঠ আরম্ভ করলেন। কিন্তু তিনি বারবার বেদান্তের অদ্বৈতবাদী অপব্যাখ্যায় আহত হয়ে অধ্যাপককে সঠিক অর্থ বিষয়ে নিবেদন করলে তিনি রামানুজের এ ব্যাখ্যা শুনে বলতেন, এটা মুখ্যার্থ নয়, গৌণার্থ; কিন্তু অন্তরে অন্তরে বুঝতে পারলেন, এই বালক সামান্য নয়। ভবিষ্যতে এ অদ্বৈত মতের বিশেষ শত্রু হয়ে দাঁড়াবে। তিনি রামানুজকে একজন ভবিষ্যৎকালীয় পরম শত্রু জেনে তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেন। কিন্তু শ্রীলক্ষ্মীনারায়ণের কৃপায় অলৌকিকভাবে তিনি রক্ষা পান।
পরবর্তীতে রামানুজ কাঞ্চিপূর্ণের নিকট দীক্ষা প্রার্থনা করলে দৈন্যবশত তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তখন তিনি শ্রীবরদরাজের আজ্ঞায় মহামুনি শ্রীযামুনাচার্যের শিষ্য মহাপূর্ণকে গুরুরূপে গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে মহাপূর্ণের প্রেরণায় গোষ্ঠীপূর্ণের কাছে মন্ত্ররহস্য শ্রবণ করতে যান। তিনি আঠারোবার রামানুজকে প্রত্যাখ্যান করার পরও তার নিষ্ঠা দেখে স-রহস্য মন্ত্র প্রদান করেন। কাঞ্চিপূর্ণ, মহাপূর্ণ, গোষ্ঠীপূর্ণ, মালাধর ও বররঙ্গ- এই পঞ্চমহানুভব ভাগবত যামুনাচার্যের প্রিয় শিষ্য ছিলেন; শ্রীরামানুজ তাঁদের সকলকেই শিক্ষা-গুরুরূপে বরণ করেন। তিনি শ্রীরঙ্গমের সৎ-সম্প্রদায়ের আচার্য ও সংরক্ষকরূপে অধিষ্ঠিত হয়ে অদ্বৈত-মত বিরুদ্ধ বিশিষ্ঠাদ্বৈতবাদ প্রচার করতে লাগলেন। বিশিষ্ঠাদ্বৈতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি শ্রীভাষ্য রচনা করেন। 
একসময় তিনি তাঁর পঞ্চাশ জন শিষ্যদের নিয়ে এক গ্রামে যান, সেখানে তাঁর দুজন শিষ্য ছিলেন, একজন ধনী ও অন্যজন অত্যন্ত দরিদ্র। যেহেতু দরিদ্র শিষ্যটি তাঁর পঞ্চাশ জন শিষ্যদের দেখভাল করতে সমর্থ হবে না তাই তিনি তাঁর এক শিষ্যকে ঐ ধনী শিষ্যের বাড়িতে আগমন বার্তা জানাতে প্রেরণ করেন। গুরুদেবের আগমন বার্তা পেয়ে ধনী শিষ্যটি আনন্দে আত্মহারা হয়ে সকল ব্যবস্থা করতে থাকেন। কিন্তু তিনি বার্তা নিয়ে আসা গুরুভ্রাতার কোনো যত্ন নেন নি। তা জানতে পেরে রামানুজ আচার্য দরিদ্র শিষ্যের গৃহে যেতে মনস্থ করেন। তাঁর এই শিষ্যটি এতই দরিদ্র ছিল যে তাদের স্বামী-স্ত্রীর সংসারে প্রত্যেকের মাত্র একটি করে কাপড় ছিল, তাও মলিন ও শত-ছিদ্রযুক্ত। এজন্য তার স্ত্রী ঘর থেকে বের হতেন না। স্বামী ভিক্ষা করে আনলে তিনি রন্ধন করতেন।
এদিন যখন স্বামী নগরে ভিক্ষায় গিয়েছিলেন তখন রামানুজাচার্য সেখানে আগমন করেন। কিন্তু উপযুক্ত বস্ত্র না থাকায় সেই শিষ্যা গুরুদেবের সামনে আসতে না পারছে না বুঝতে পেরে রামানুজাচার্য একটি উত্তরীয় তাকে জানালা দিয়ে দেন। তারপর সেই মাতাজি তা গায়ে জড়িয়ে এসে গুরুদেবকে প্রণাম নিবেদন করেন এবং শিষ্যগণসহ তাঁকে বসতে দেন। কিন্তু তিনি ভাবছিলেন স্বামীর আসতে এখনও অনেক দেরী। তিনি কীভাবে তাঁদের আপ্যায়ন করবেন? তাই তিনি তার এক প্রভাবশালী ধনী বণিক প্রতিবেশীর কাছে সাহায্য চাইতে যেতে মনস্থির করেন। কিন্তু ঐ বণিক ছিল খুব কামুক। সে সাহায্যের  বিনিময়ে ঐদিন রাতে তাকে ভোগ করতে কামনা করে। তখন মাতাজি গুরুদেবের সেবার চিন্তা করে আপাতত রাজী হন এবং চাল-ডাল নিয়ে এসে দ্রুত রান্না করে গুরুদেব ও গুরুভ্রাতাগণকে প্রসাদ সেবা করান। এরমধ্যে তার স্বামী গৃহে এসে গুরুদেবকে দেখে খুব খুশী হন এবং তাঁদের প্রসাদ সেবা হয়ে গেছে জেনে বিস্মিত হয়ে স্ত্রীর কাছে জানতে চাইলে তিনি সবকিছু খুলে বলেন। তখন তার স্বামী গোবিন্দ যা চায় তাই হবে বলেন। এরমধ্যে রামানুজাচার্য প্রস্থান করবার সময়, (যদিও তারা তাঁকে তাদের বিপদ সম্বন্ধে কিছুই জানান নি) তিনি তাদের সকল বিপদ কেটে যাবে বলে আশীর্বাদ করেন। পথিমধ্যে তাঁর সেই ধনী শিষ্যের সাথে দেখা হয়, তিনি তাঁকে বলেন, গুরুদেব ও গুরুভ্রাতা সকলেই গুরুত্বপূর্ণ, তুমি যদি গুরুভ্রাতাদের অবজ্ঞা কর, তা গুরুদেবকেই অবজ্ঞা করা। তখন সেই ধনী শিষ্য তাঁর ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হলে রামানুজাচার্য তার সেবা গ্রহণ করেন।
সেদিন রাতে মাতাজি ও তার স্বামী ঐ ধনী বণিকের বাড়িতে যান। মাতাজি বণিককে রামানুজাচার্যের ভুক্তাবশেষ প্রদান করেন। সেই প্রসাদ গ্রহণ করে বণিকের মন পরিবর্তন হয়ে যায়। সে সহসা দেখতে পায় চক্র-গদাধারী ভগবান শ্রীনারায়ণ স্বয়ং মাতাজিকে রক্ষা করছেন এবং সকল ব্রহ্মা- মাতাজির চরণে প্রণাম করছে। এটি দেখে সে তার চরণে পতিত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকেন। প্রার্থনাবাক্যের শব্দ শুনে মাতাজির স্বামী অন্য ঘর সেখানে আসেন এবং তা দেখে বিস্মিত হন। পরবর্তীতে সেই বণিক রামানুজ আচার্যের নিকট সপরিবারে দীক্ষাগ্রহণ করে ভক্তিজীবন যাপন করতে শুরু করেন এবং আজীবন সেই গৃহস্থদআবয়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেন।
এছাড়াও রামানুজাচার্যের মাধ্যমে অনেক লীলা সংঘটিত হয়েছে। ভারতবর্ষব্যাপী সুপ্রাচীন বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করে পরবর্তীতে তিনি শ্রীরঙ্গমে বাস করতে থাকেন।

1 মন্তব্য