-->

মহাবেদী মহোৎসব- শ্রীজগন্নাথের মহিমান্বিত রথযাত্রা

সমগ্র জগতের মানুষের উদ্ধারের জন্য পরমেশ্বর ভগবান শ্রীজগন্নাথের অপ্রাকৃত রথযাত্রা মহারাজ ইন্দ্রদ্যূম্ন এর সময় হতে চলে আসছে। শ্রীজগন্নাথদেব রাজা ইন্দ্রদ্যূম্নকে রথযাত্রা সম্পর্কিত যে নির্দেশাবলী দিয়েছিলেন তা পরবর্তীতে শ্রীনারদ মুনি দেবসেনাপতি কার্তিকেয়কে স্কন্দপুরােেণর জ্ঞান প্রদানকালে প্রদান করেন, অধ্যাবধি পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে সেই একই নিয়ম পালিত হচ্ছে। রথনির্মাণ থেকে শুরু করে রথযাত্রা, পুনর্যাত্রা এবং ভগবানের শ্রীমন্দিরে প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত এই নির্দেশ প্রণীত।

mahavedi-mohotsav-rath-yatra

রথনির্মাণ : মাঘমাসের বসন্তপঞ্চমী হতে রথ নির্মাণের কাঠ সংগ্রহ করা হয়। রথের ননির্মাণকার্য শুরু হয় প্রতিবছর অক্ষয় তৃতীয়া তিথি হতে। শ্রীজগন্নাথদেবের রথ ষোলো চাকা বিশিষ্ট এবং ‘গরুড়ধ্বজ’ নামে আখ্যায়িত। বলদেবের রথ বারো চাকাবিশিষ্ট, নাম ‘তালধ্বজ’ এবং সুভদ্রামাতার রথ দশ চাকা বিশিষ্ট ও ‘পদ্মধ্বজ’ নামে বিখ্যাত। এছাড়াও রথত্রয় যতাক্রমে চক্রদ্বজ, হলধ্বজ ও দর্পদলন নামেও আখ্যায়িত হয়। রথ নানা বেদী ও কাষ্ঠপুত্তলী দ্বারা সজ্জিত করা হয়। এছাড়াও রথের চূড়া থেকে চাকার উপরিভাগ পর্যন্ত বিচিত্র পতাকা দ্বারা সজ্জিত করা হয়। শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে মহাপ্রভুর সমসাময়িক রথযাত্রার বিবরণকালে রথের সৌন্দর্যবিষয়ে নিম্নোক্ত পয়ার রয়েছে- 
রথের সাজনি দেকি লোকে চমৎকার। 
নব হেমময় রথ সুমেরু আকার ॥
শত শত সু-চামর দর্পণে উজ্জ্বল।
উপরে পতাকা শোভে চাঁদোয়া নির্মল ॥
ঘাঘর কিঙিকণী বাজে, ঘণ্টার ক্কণিত।
নানা চিত্র পট্টবস্ত্রে রথ বিভূষিত ॥
(শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য ১৩.১৯-২১)
জগন্নাথের রথের দ্বারদেশে ব্রহ্মা ও ইন্দ্র, বলদেবের রথের দ্বারে রুদ্র ও সাত্যকি এবং সুভদ্রাদেবীর রথের দ্বারে ভূদেবী ও শ্রীদেবী অধিষ্ঠিত হন। গু-িচা মার্জন : শ্রীজগন্নাথদেবের গু-িচামন্দিরে বিজয়ের পূর্বদিনে গু-িচা মন্দির মার্জন বা পরিষ্কার করা হয়। একেই ‘গু-িচা মার্জন’ বলা হয়। রথযাত্রার মাধ্যমে জগন্নাথ শ্রীমন্দিরের রত্নবেদী ছেড়ে গু-িচা মন্দিরের মহাবেদীতে গমন করেন। গুন্ডিচা মন্দির যে স্থানে স্থাপিত, সেই স্থানেই স্বায়ম্ভূব মনু পূর্বে যজ্ঞ সম্পাদন করেন, যে যজ্ঞে জগন্নাথরূপে শ্রীকৃষ্ণ প্রকাশিত হন। তাই একে যজ্ঞবেদীও বলা হয়। এছাড়াও রথের এদিন শ্রীমন্দির, শ্রীজগমোহন, সিংহাসন, রত্নবেদী-সবকিছুই মার্জন করা হয়।

পহন্ডি বিজয় : ‘পাণ্ড বিজয়’ বা ‘পহণ্ডি বিজয়’ রথযাত্রার সময় জগন্নাথের রত্নসিংহাসন থেকে অবতরণ উৎসব। মূলত ভারতবর্ষের প্রাচীন মন্দিরের মূল বিগ্রহগণ কখনও গর্ভগৃহের বাইরে আসেন না। তাঁদের প্রতিভূ অর্চাবিগ্রহগণ বিভিন্ন উৎসবে বাহিরে আগমন করেন। জগন্নাথের দুটি অর্চাবিগ্রহ রঘুনাথ ও মদনমোহন বিভিন্ন উৎসবে অংশগ্রহণ করলেও স্নানযাত্রা ও রথযাত্রায় জগন্নাথের মূলবিগ্রহই বাইরে আসেন। সংস্কৃতের ‘পাদহু-ন’ (ধীরে ধীরে পদবিন্যাস) শব্দের ওড়িয়া অপভ্রংশ হচ্ছে পহণ্ডি বিজয়। জগন্নাথ ও বলদেবকে অবতরণ করিয়ে ধাপে ধাপে রথে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় প্রতি পদবিক্ষেপের জন্য ‘তুলি’ (তুলার নরম বালিশ) দেওয়া হয়।
আরদিন মহাপ্রভু হঞা সাবধান।
পাণ্ড বিজয় দেখিবারে করিল গমন।
জগন্নাথ যাত্রা কৈল ছাড়ি সিংহাসন ॥
আপনি প্রতাপরুদ্র লঞা পাত্রগণ।
মহাপ্রভুরগণে করায় বিজয় দর্শন ॥
অদৈদ্বত, নিতাই আদি সঙ্গে ভক্তগণ।
সুখে মহাপ্রভুদেখে ঈশ^রগমন ॥
বরিষ্ঠ দয়িতাগণ যেন মত্ত হাতী।
জগন্নাথবিজয় করায় করি হাতাহাতি ॥
প্রভু পদাঘাতে তুলি হয় খণ্ড খণ্ড।
তুলা সব উড়ি যায় শব্দ হয় প্রচণ্ড ॥
বিশ্বম্ভর জগন্নাথে কে চালাইতে পারে?
আপন ইচ্ছায় চলে করিতে বিহারে ॥
(শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য ১৩.৩, ৫-৮, ১২-১৩)
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীজগন্নাথ সমস্ত বিশ্বের ভরণকর্তা, তাঁকে কেউ চালাতে পারেন না, তাঁর এই চরন কেবল তাঁর নিজের ইচ্ছায় লীলাসাধন।

ছেরাপহরা : বিগ্রহগণ রথে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রাচীন রীতি অনুসারে ঊড়িষ্যার মহারাজগণ স্বর্ণমার্জনী নিয়ে রথ ও রথের গমনের পথ পরিষ্কার করেন। লোকশ্রুতি অনুসারে পূর্বে এই সেবা রাজা পুরুষোত্তমদেবের পর বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে মহাপ্রভুর কৃপালাভ করবার মানসে রাজা প্রতাপরুদ্র পুনরায় এই সেবা চালু করেন।
তবে প্রতাপরুদ্র করে আপনে সেবন। সুবর্ণ-মার্জনী লঞা করে পথ সম্মার্জন ॥ চন্দন জলেতে করে পথ নিষেচনে। তুচ্ছসেবা করে বসি রাজসিংহাসনে ॥ উত্তম হঞা রাজা করে তুচ্ছ সেবন। অতএব জগন্নাথের কৃপার ভাজন ॥ মহাপ্রভু সুখ পাইল সে সেবা দেখিতে। মহাপ্রভুর কৃপা হৈল সে সেবা হইতে ॥ (শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য ১৩.১৫-১৮)

রথযাত্রা : ছেড়াপহরার পর শ্রীবিগ্রহগণকে নানা বস্ত্রালংকারে সুসজ্জিত করা হয় এরযর পূজা সম্পাদন করে রথ টানা হয়। বর্তমানে ভারতসরকার রথের চারিদিকে পুলিশ নিযুক্ত করে থাকে। রথের চারিদিকে বিভিন্ন সংকীর্তন দল হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করে থাকে। শ্রীচৈতন্যমহাপ্রভু তা প্রবর্তন করেন।
তবে মহাপ্রভু সব লঞা ভক্তগণ।
স্বহস্তে পড়াইল মাল্য চন্দন ॥
কীর্তনীয়াগণে দিল মাল্যচন্দন।
স্বরূপ শ্রীবাস যাহা মুখ্য দুইজন ॥
চারি সম্প্রদায় হৈলা চব্বিশ গায়ন।
দুই দুই মৃদঙ্ করি হৈল অষ্টজন ॥
তবে মহাপ্রভু মনে বিচার করিয়া।
চারি সম্প্রদায়ে দির গায়েন বাঁটিয়া ॥
জগন্নাথের আহে চারি সম্প্রদায় গায়।
দুই পাশে দুই, পাছে এক সম্প্রদায় ॥
সাত সম্প্রদায়ে বাজে চৌদ্দ মাদল।
যার ধ্বনি শুন বৈষ্ণব হৈল পাগল ॥
বৈষ্ণবের মেঘঘটায় হৈল বাদল।
কীর্তনানন্দে সব বর্ষে নেত্র জল ॥
ত্রিভুবন ভরি উঠে কীর্তনের ধ্বনি।
অন্য বাদ্যাদির ধ্বনি কিছুই না শুনি ॥
 (শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য ১৩.২৯, ৩২, ৪৭-৫০)
এরকম বিভিন্ন দরে কীর্তনীয়া, খোল-করতাল বিতরণ করে কীর্তন আরম্ভ করিয়ে মহাপ্রভু আরেকটি ভিন্ন লীলা প্রকাশ করেন। তিনি নিজে সাত রূপ ধারণ করে সাতটি দলেই প্রবেশ করে কীর্তনে অংশগ্রহণ করতে লাগলেন। প্রত্যেক দল বাবছিল মহাপভু তাঁদের দলেই রয়েছেন। এভাবে মহাপ্রভু সকলকে কৃপা করেন।
রথ যাত্রাপথে ‘বলগণ্ডি’ নামে এক স্থানে আগমন করলে সেখানে মধ্যাহ্ণকালীন প্রকর রৌদ্রের জন্য রথের বিশ্রাম হয়। এর একপাশে ‘বিপ্রশাসন’ নামক বাগান রয়েছে। একানে অনেক ব্রাহ্মণ বাস করতেন বরে এই নাম। এখানে প্রচুর নারিকেল, কাঠাল, বিভিন্ন ফুলে শোভিত বাগান। সেখানে জগন্নাথদেবের ভোগ হয়, যা বলগ-ি ভোগ নামে বিখ্যাত।
পূর্বে জগন্নাথ মন্দির থেকে গু-িচা মন্দির পর্যন্ত যাত্রাপথে মালিনী নামে এক শাখানদী ছিল। তখন ছয়টি রথ নির্মিত হতো। প্রতম তিনটি জগন্নাথ মসিন্দর হতে এ পর্যন্ত আসলে জগন্নাথদেব রথ হতে নেমে নৌকাযোগে অপর পারে পৌঁছালে অপর তিনটিতে আরোহন করে গুণ্ডিচায় যেতেন। পরে রাজা নরসিংহদেবের স্ত্রী শ্রদ্ধাবালাদেবী এর উপর আঠারনালা (সেতু) নির্মাণ করেন, যা ‘শ্রদ্ধাবালি’ নামে পরিচিত ছিল। যা জগন্নাথের পারাপার পথ হিসেবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে এই সেতু ভেঙে গেলে অন্য এক শাসক এই নদী ভরাট করে দেন ফলে এখন তিনটি রথেই রথযাত্রা সম্পাদিত হয়।
গু-িচায় আগমন : রথযাত্রার তাৎপর্য হচ্ছে ভগবান শ্রীজগন্নাথ, যিনি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ তাঁর বৃন্দাবনবাসী ভক্তদের দর্শন প্রদান করতে দ্বারকা থেকে বৃন্দাবনে গমণের লীলাকে প্রতিবছর রথযাত্রার মাধ্যমে চিত্রায়িত করেন। এসময় যে- বা যারা এমনকি অসশ্রদ্ধার সাথেও রথ দর্শন করে, জগন্নাথদেবের বিশেষ কৃপা লাভ করেন। গু-িচা মন্দির, যা অভিন্ন বৃন্দাবন, তাকে বলা হয় ‘মহাবেদী’। এজন্য রথযাত্রা মহাবেদী মহোৎসব নামে পরিচিত। রথের দিন সন্ধ্যায় রথ গু-িচার দ্বারে এসে উপনীত হলে রথেই ভোগারতি হয়। তারপর জগন্নাথ গু-িচার যজ্ঞবেদীতে পুনরায় পহ-িবিজয় করেন এবং আটদিন অবস্থান করেন।

হেরাপঞ্চমী : রথযাত্রার সময় শ্রীজগন্নাথদেব লক্ষ্মীদেবীর অনুমতি নিয়ে দুদিনের জন্য গু-িচায় গমন করেন, কিন্তু চারদির অতিবাহিত হয়ে গেলেও যকন জগন্নাথ ফিরে না আসেন, তখন লক্ষ্মীদেবী অধীরা হয়ে উঠেন এবং নিজেই গু-িচায় গমন করেন। এসময় তিনি পালকীতে চরে সে স্থানে গমন করেন কিন্তু জগন্নাথের দয়িতাসেবকগণ তাঁকে জগন্নাথকে নিয়ে যেতে বাধা দেন, তখন লক্ষ্মীদেবী ‘রথভঙ্গ’ করে ফিরে আসেন।

উল্টোরথ : রথের সপ্তমদিন সন্ধারতির পর ‘সন্ধ্যাদর্শন’ নামক উৎসব হয়। এরপরদিন রথতিনটি পুনরায় দক্ষিণাভিমুখে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর দশমী তিথিতে জগন্নাথ পুনরায় রথে আরোহণ করে শ্রীমন্দিরে যাত্রা করেন। প্রথমে জগন্নাথদেব মাসীমা (যশোদামাতার ভগিনী অর্ধাসনী দেবীর) মন্দিরে গমন করলে সেখানে ভোগ হয়। এজন্য রথযাত্রাকে অনেক সময় ‘মাসীর বাড়ি’ গমনও বলা হয়। এরপর যখন রথ শ্রীমন্দিরের নিকটবর্তী মর্চিকাদেবীর মন্দিরে পৌঁছে, তখন রাজা শ্রীমন্দির থেকে শ্রীলক্ষ্মীদেবীর এক বিগ্রহ সেখানে নিয়ে আসলে ‘লক্ষ্মী-নারায়ণ-ভেট’ উৎসব হয়, লক্ষ্মীদেবী জগন্নাথের রথে আরোহন করেন। রথ যখন শ্রীমন্দিরের সিংহদ্বারে আসে, তখন অধরপণা নামক ভোগ হয়।
শয়ন একাদশী তিথিতে জগন্নাথদেবকে রথের উপর স্বর্ণালংকার দ্বারা ‘রাজবেশ’ ধারণ করানো হয়। এবং দ্বাদশীর দিন শ্রীবিগ্রহগণ মন্দিরে প্রবেশ করেন। তারপর জগন্নাথদেবের ‘বন্দাপনা’ হয় এবং তিনি রত্নসিংহাসনে আরোহন করেন।
রথযাত্রার মহিমা সম্বন্ধে স্কন্দপুরাণে বিশদ বর্ণিত হয়েছে।
রথস্থিতং ব্রজন্ত তং মহাবেদীমহোৎসবে।
বে পশ্যন্তি মুদা ভক্ত্যা বাসং তেষায় হরের্পদে ॥
 -যারা এই মহাবেদী মহোৎসব সানন্দহৃদয়ে ভক্তিসহকারে অবলোকন করে, তারা সতত শ্রীহরির পদে বাস করেন।
এমনকি স্বর্গের দেবতাগণও রথে যোগদানের জন্য এই দিন আগমন করে থাকেন। এই উৎসব এতই পবিত্র যে এর নাম উচ্চারণ করলেও পাতক বিনষ্ট হয়।
 নাতঃ পরতরো লোকে মহাবেদী মহোৎসবাৎ।
 সর্বপাপহরো যোগো সর্বতীর্থ ফলপ্রদঃ ॥
অর্থাৎ এই মহাবেদী মহোৎসবের ন্যায় পাপবিনাশক সর্বতীর্থফলপ্রদ উৎকৃষ্টতম শুভযোগ আর নেই। এসময় জগন্নাথদেবকে দর্শন, এমনকি কেবল রথদর্শন, রথ স্পর্শ, রথের ছায় স্পর্শ, রথের সম্মুখে হরিনামসংকীর্তন ও নৃত্য, প্রণামনিবেদন, মার্জনসহ সকল কাজে জগন্নাথ অত্যন্ত প্রীত হন। কেবল রথযাত্রা নয় এমনকি উল্টোরথেও ভক্ত, অভক্ত সকলে সমান কৃপালাভ করতে পারেন।

https://facebook.com/hksamacar

0 মন্তব্য